চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আবারও এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হয়ে রইল রিয়াল মাদ্রিদ। গ্রিসের ক্লাব এইকে এথেন্সের মাঠে লড়াই করতে নেমে দুইবার পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে স্প্যানিশ জায়ান্টরা। জুড বেলিংহাম ও কিলিয়ান এমবাপ্পের গোলে দুইবার সমতায় ফেরার পর, ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে অর্থাৎ যোগ করা সময়ে জয়সূচক গোলটি করেন ফেদেরিকো ভালভার্দে। এই নাটকীয় জয়ের ফলে হারের শঙ্কা কাটিয়ে পূর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে হোসে মরিনহোর দল। এই জয়ের মাধ্যমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা চার ম্যাচ জেতার পাশাপাশি সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সপ্তম জয় তুলে নিল রিয়াল মাদ্রিদ।

বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের অলউইন অ্যারেনায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বের চতুর্থ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল এইকে এথেন্স ও রিয়াল মাদ্রিদ। প্রথমার্ধে ১-১ সমতা থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে স্বাগতিকরা আবারও এগিয়ে যায়। তবে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সমতা ফেরানোর পর যোগ করা সময়েই জয় নিশ্চিত করে সফরকারীরা।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল নিয়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করে রিয়াল। তবে নিজেদের ঘরের মাঠে সহজে ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা ছিল না এইকে এথেন্সের। বরং তারা পাল্টা আক্রমণে রিয়ালের রক্ষণভাগকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল।

খেলার শুরুতেই স্বাগতিকদের একটি আক্রমণ ঠেকিয়ে দেন রিয়ালের গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া। তবে ১২তম মিনিটে আর বাধা দিতে পারেননি বেলজিয়ান এই গোলরক্ষক। সাবেক রিয়াল ফরোয়ার্ড লুকা ইয়োভিচের দেওয়া পাসে বক্সের ভেতর বল পেয়ে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে এইকেকে লিড এনে দেন আবুবাকরি কোইতা।

গোল হজম করার পর আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায় রিয়াল। ২৮তম মিনিটে জুড বেলিংহামের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যায়। তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি এই ইংলিশ মিডফিল্ডারকে।

৩২তম মিনিটে এক দুর্দান্ত গোলে সমতা ফেরান বেলিংহাম। বাঁ প্রান্ত থেকে মার্ক কুকুরেয়ার দেওয়া নিচু ক্রসটি ব্যাকহিলের সাহায্যে জালে পাঠান তিনি। তার এই অভিনব ফিনিশিংয়ের সামনে অসহায় ছিলেন এইকের গোলরক্ষক আলবের্তো ব্রিনিওলি। ফলে ১-১ সমতা নিয়েই প্রথমার্ধ শেষ হয়।

দ্বিতীয়ার্ধেও বলের আধিপত্য ছিল রিয়ালের দখলে। তবে স্বাগতিকদের শক্ত রক্ষণ ভাঙতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল মরিনহোর শিষ্যদের। অন্যদিকে সুযোগ পেলেই দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে আঘাত হানছিল এইকে।

ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে এবং খেলার গতি পরিবর্তন করতে ৬৭তম মিনিটে জোড়া পরিবর্তন আনেন কোচ মরিনহো। বার্নার্দো সিলভার পরিবর্তে এন্দ্রিক এবং ইয়ান দিয়োমান্দের জায়গায় ভালভার্দেকে মাঠে নামান তিনি। শেষ পর্যন্ত এই কৌশলগত সিদ্ধান্তই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে বদলি খেলোয়াড়দের মাঠে নামানোর পরপরই প্রথম ধাক্কা খেতে হয় রিয়ালকে। ৭৫তম মিনিটে এক দুর্দান্ত পাল্টা আক্রমণে আবারও এগিয়ে যায় এইকে। কোইতার পাসে বক্সে বল পেয়ে নিচু শটে গোল করেন স্তাভরোস পিলিওস। ফলে ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে ২-১ গোলে পিছিয়ে পড়ে রিয়াল মাদ্রিদ।

কিন্তু স্বাগতিকদের সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি খুব বেশি সময়। মাত্র তিন মিনিট পরেই সমতা ফেরান কিলিয়ান এমবাপ্পে। বেলিংহামের বাড়ানো বল ধরে ডান দিক দিয়ে এগিয়ে যান ডেনজেল ডামফ্রিস। তার পাস থেকে খুব কাছ থেকে গোল করেন ফরাসি ফরোয়ার্ড। ৭৮তম মিনিটে স্কোরলাইন ২-২ সমতায় ফিরে আসে।

সমতায় ফেরার পর জয়ের জন্য আরও মরিয়া হয়ে ওঠে রিয়াল। আক্রমণের চাপ বাড়িয়ে একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকে সফরকারীরা। অন্যদিকে নিজেদের রক্ষণ সামলাতেই হিমশিম খেতে হয় এইকেকে।

শেষ দিকে বড় একটি সুযোগ পেয়েছিলেন এমবাপ্পে। এন্দ্রিকের তৈরি করা আক্রমণ থেকে তার নেওয়া জোরালো শটটি ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। তখন মনে হচ্ছিল, দুই দল হয়তো পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়বে।

কিন্তু যোগ করা সময়ে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। বক্সের বাইরে থেকে এক দুর্দান্ত শটে রিয়ালের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেন ফেদেরিকো ভালভার্দে। উরুগুইয়ান এই মিডফিল্ডারের গোলে শেষ মুহূর্তে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় সফরকারীরা। বাকি সময় সেই ব্যবধান ধরে রেখে এক রোমাঞ্চকর জয় নিশ্চিত করে মরিনহোর দল।

এই জয়ের ফলে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজেদের শতভাগ জয়ের রেকর্ড ধরে রাখল রিয়াল। প্রথম চার ম্যাচের সবকটিতে জিতে পূর্ণ ১২ পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে স্প্যানিশ জায়ান্টরা। একই সঙ্গে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা সাত ম্যাচ জয়ের ধারাও অব্যাহত রেখেছে তারা।

এর আগে লিগ পর্বে ইন্টার মিলানকে ২-১, রোমাকে ৪-৩ এবং আরবি লাইপজিগকে ৪-১ গোলে হারিয়েছিল রিয়াল। এবার এইকের মাঠে আরও একটি জয় যোগ হলো তাদের সংগ্রহে।

মরিনহোর দলের জন্য এথেন্সের এই জয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রিসের মাটিতে অতীতে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় খুব একটা স্বস্তিদায়ক অভিজ্ঞতা ছিল না রিয়ালের। এইকের বিপক্ষে আগের দুই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচও ড্র হয়েছিল। এবার সেই প্রতিপক্ষের মাঠে পিছিয়ে পড়েও তিন পয়েন্ট নিশ্চিত করল তারা।

এটি চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রিয়ালের দ্বিতীয় নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। গত ১৪ অক্টোবর রোমার মাঠে ৩-১ গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ আট মিনিটে তিন গোল করে ৪-৩ ব্যবধানে জিতেছিল তারা। এবার এইকের বিপক্ষেও শেষ মুহূর্তে জয় ছিনিয়ে নিল মরিনহোর শিষ্যরা।