সরকারের ভুল পদক্ষেপ এবং পরিস্থিতি সামলানোর অযোগ্যতার কারণেই পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন বর্তমান পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি মনে করেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
আজ বুধবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। গাজীপুরে এনসিপির শ্রমিক সংগঠন 'জাতীয় শ্রমিক শক্তি'র আয়োজিত একটি গায়েবানা জানাজায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলায় গুরুতর আহত হওয়া নেতা-কর্মীদের দেখতে তিনি ঢাকা মেডিকেলে গিয়েছিলেন।
নাহিদ ইসলাম জানান, নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের স্মরণে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক গায়েবানা জানাজার কর্মসূচিতে পুলিশ ও বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম ফকিরসহ মোট ১৭ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী শ্রমিকও রয়েছেন। আহতদের অনেকেরই শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন।
পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই আন্দোলন অত্যন্ত ন্যায্য ও যৌক্তিক। তবে সরকার এই আন্দোলনকে সঠিকভাবে ‘ডিল’ করতে পারেনি, যার ফলে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার শ্রমিকদের দাবির প্রতি কর্ণপাত না করে কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তা থামানোর চেষ্টা করছে। আন্দোলন শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পর মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও তিন দিন ধরে কোনো সভা হয়নি। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আজ প্রথম সভা করা হয়েছে, যা সরকারের চরম অবহেলার প্রমাণ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন এটি কোনো শ্রমিক আন্দোলন নয়। অর্থাৎ সরকার এখনো এই যৌক্তিক আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না, বরং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে একে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে এবং সহিংসতার চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।
এ বিষয়ে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “আমরা বলব, এই আন্দোলনে সহিংসতা শুরু করেছে বিএনপি নিজেই। শ্রমিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতা হয়েছে এবং তাদের ওপর সরকারদলীয় সহিংসতা এবং নিপীড়ন চলমান আছে। গতকাল বিএনপির গুন্ডাদের নামানো হয়েছে হকিস্টিক ও স্টাম্প হাতে। তারা রাস্তায় নেমেছে শ্রমিকদের পেটানোর জন্য। বিএনপি বা এই গুন্ডাদের কে এই দায়িত্ব দিয়েছে?”
দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে যেভাবে শ্রমিক আন্দোলন দমন করা হতো, বর্তমান সরকারও ঠিক সেই একই কর্তৃত্ববাদী কায়দা ও প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করছে। শ্রমিক-মালিক সমঝোতা বা রাজনৈতিক সমাধানের পথ না বেছে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়ার কারণেই আন্দোলন এই পর্যায়ে এসেছে।
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে ‘বাংলাদেশের শত্রু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “তারা যেকোনো পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে, করে আসছে এবং সেটার সুযোগ বিএনপি করে দিচ্ছে গত সাত মাস ধরে। তারা বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষত গাজীপুর, সাভার এলাকায় আওয়ামী লীগকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। বিচারের ব্যাপারে বিএনপি আপস করেছে এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যে জাতীয় ঐকমত্য ছিল, সেই ঐকমত্য ভঙ্গ করেছে। বিএনপি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। ফলে এই পরিস্থিতির দায় সরকার এবং বিএনপিকেই নিতে হবে।”
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “এখনো সময় আছে আপনারা কোনো ধরনের টালবাহানা না করে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নিন, তাঁদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলুন, আলোচনায় আসুন। কোনো ধরনের প্রতারণা করার চেষ্টা করবেন না।”
সবশেষে, আন্দোলনে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের পরিবারকে আইএলওর কনভেনশন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি আরও বলেন, তৌফিকের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অন্যায় মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেপ্তারকৃত শ্রমিক নেতা-কর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। পোশাকশিল্পের মালিক, শ্রমিক এবং সব রাজনৈতিক পক্ষকে সাথে নিয়ে সরকারকে অবিলম্বে একটি সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছাতে হবে।