জাতির প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব, তবে এর মূল ভিত্তি অবশ্যই অক্ষুণ্ন রাখতে হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। সংবিধান দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে গণফোরাম আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন। বুধবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই সভায় তিনি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
সংসদীয় বিভিন্ন কমিটিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ থাকলেও সংবিধান সংশোধন কমিটিতে তাদের অনুপস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেন মন্ত্রী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘সব সংসদীয় কমিটিতে তাঁরা যাবেন, বৈঠক করছেন, আসছেন, নাম দিচ্ছেন। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে তাঁরা নাম দেবেন না। এটা কী করবার?’
বিরোধী দলের এই অবস্থানকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী জাহিদ হোসেন বলেন, ‘৩৪টা কমিটির মধ্যে আপনি নাম দিলেন, যুক্তিটা কী বলেন তো দেখি। সব কমিটিতে যাবেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যাবেন না—এখানে গোস্সার কী কারণ আছে? রাষ্ট্র কি গোস্সা করে চলবে? রাষ্ট্র তো যৌক্তিকতা দিয়ে চলতে হবে।’
সংবিধান রচনার ইতিহাস নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা খুব স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করেছিলেন, সংবিধান দিবসে তাঁদের প্রতি সম্মান জানাচ্ছি। পৃথিবীর ইতিহাসে এক স্বল্প সময়ে সংবিধান লেখা ও গ্রহণ করার ইতিহাস খুব বেশি জাতির নেই। এটার জন্য বাংলাদেশিরা গর্ব করতে পারে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন আরও উল্লেখ করেন যে, জনগণের পরিবর্তিত প্রয়োজন মেটাতে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা থাকে। তিনি বলেন, ‘মানুষের অনেক প্রয়োজন আছে। সেগুলো পূরণ করার জন্য সংবিধান সংশোধনেরও প্রয়োজন রয়েছে। সংবিধান সংশোধনের পক্ষে যারা থাকবে, মানুষ তাদের পক্ষেই থাকবে। বাংলাদেশের মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর ট্র্যাক রেকর্ড আছে। কিন্তু তারা কখনোই বাড়াবাড়িকে পছন্দ করে না। আমরা আজকে বাড়াবাড়ি করলে কালকে কোথায় নেবে, সেটা আমাদের নিজেদের ভাবার দরকার আছে।’
সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদ রুখতে সংবিধানের মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক রেখে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ একটা জাতির জীবনে একবারই আসে। মুক্তিযোদ্ধা জীবনে আমরা আর কেউ হতে পারব না, যতই কুস্তি করি না কেন। নব্বই হয়েছে, পঁচাত্তর হয়েছে, চব্বিশও হয়েছে, একাত্তর কিন্তু আর হয়নি। কাজেই ওই স্পিরিটকে সম্মান করে তারপর প্রয়োজনের বিষয়। ভিত্তি নাড়ানো যাবে না। বিএনপি বলে সবার আগে বাংলাদেশ। আমরা বলি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে হবে।’
অন্যদিকে, সংবিধান সংস্কারের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধংদেহী পরিবেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল বলছে তাদের কথামতো সংস্কার না করা হলে শেষ পর্যন্ত এক দফার আন্দোলন করবে। একটা দল বলছে জুলাই সনদ নিয়ে বেইমানি হচ্ছে, আরেক দল বলছে এই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে। মানুষ কোন দিকে যাবে? এই লড়াইয়ে সত্য ও সঠিকের বিজয় হতে হবে। কেবল সাংগঠনিক শক্তি কিংবা সংসদ সদস্যের সংখ্যার শক্তি দিয়ে পরিবর্তনের চিন্তা করা হলে সেটা কোনোভাবেই সঠিক হবে না।’
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংবিধানপ্রণেতা ও গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেন, তবে তিনি কোনো বক্তব্য প্রদান করেননি। গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন গণফোরামের সাবেক নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাইয়িদ এবং কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান।