সরকারকে সংবিধান সংশোধনের বর্তমান পথ থেকে সরে আসার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আরেকটা সংশোধন করবেন? একটা আদালত এইটাকে একদম হোয়াইটওয়াশ করে দেবে।..এই পণ্ডশ্রমে এবং অতীতের ভুল ধারায় চলতে আমরা অভ্যস্ত নই, আমরা রাজি নই। এই জন্যই আমরা সংস্কার চাই।’
রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আজ রোববার দুপুরে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই সভায় সভাপতির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন।
সরকারি দলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে জামায়াতের আমির প্রশ্ন তোলেন, ‘আপনারা এখন সংবিধান খোঁজেন কেন? সংবিধান খুঁজতে তো সাড়ে ১৫ বছর সরকারের সদয় অনুমতি নিয়ে কিছু মিটিং আর মিছিল করেছেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদকে তো তাড়াতে পারেননি। আমরাও পারি নাই, আপনারাও পারেন নাই। এটা রিয়েলিটি।’
বিরোধীদলীয় নেতার অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি তাদের অতীত ভুলে গেছে। তিনি মনে করেন, সংবিধান সংশোধনের বর্তমান মনোভাব থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। শফিকুর রহমানের মতে, বর্তমান সংবিধান কেবল ফ্যাসিবাদের জন্মই দেয়নি, বরং একে স্থায়ী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন জামায়াতের আমির। তিনি উল্লেখ করেন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বিএনপি অনেক ক্ষেত্রে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিল। এমনকি যেসব বিষয়ে তাদের কোনো আপত্তি ছিল না, সেগুলোকেও এখন এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
শফিকুর রহমান আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। বরং দেশ ও বিদেশে দলটির কর্মীদের ‘না’ ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, যদিও জনগণের রায়ে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটিতে বিরোধী দলগুলোকে আলোচনার আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি, সরকারি দল ৭০ ভাগ জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করেছে এবং বিরোধী দল এতে অংশ নেবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার এই গণভোট বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হবে।
বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার গুরুতর অভিযোগ তোলেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় বিএনপি কৌশলে আওয়ামী লীগের কাছে ভোট ভিক্ষা চেয়েছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের এক গডফাদার এ কথা বলেছে। এমনকি বিএনপির নাটোরের এক এমপি নির্বাচনে সফলতার জন্য আওয়ামী লীগের লোকজনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের বিএনপিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র, মাদক ও অর্থের অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হলে সরকারের দেশ পরিচালনার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, সরকার একদিকে বিভিন্ন কার্ড দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে, অন্যদিকে করের বোঝা ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। প্রবাসীদের পুনর্বাসন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরাতে সরকারের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা নেই।
নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে চাঁদাবাজি ও দখলদারির প্রভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের আমির। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পঞ্চগড়ে কৃষকেরা চারটি লাউ এক টাকায় বিক্রি করলেও ঢাকায় সেই একই লাউ ৪০ থেকে ৬০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
রাজধানীর মিরপুরে বেসরকারি মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনার কথা উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের কেবল পদত্যাগ যথেষ্ট নয়, তাঁকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার তাদের পাহাড়সম ব্যর্থতা ঢাকতে কৌশলে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে। এছাড়া বিরোধী দলের কর্মসূচি নিয়ে সরকারের উদ্বেগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, লংমার্চে জনসমর্থন নেই বলে দাবি করা হলেও সরকার কেন এত উদ্বিগ্ন, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান যেন বিরোধী দলের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা না করা হয়।
জামায়াতের আমির বলেন, প্রধানমন্ত্রী ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় দুপুরের খাবার খেলে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। তবে সাধারণ মানুষ যাতে শান্তিতে দুই বেলা খেতে পারে এবং স্বস্তিতে বসবাস করতে পারে, সরকার যেন সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
আলোচনা সভায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, তারেক রহমানকে অতীত থেকে সবক নিতে হবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের লোকজনের কারণেই তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। চারদিকে যুদ্ধ করে প্রধানমন্ত্রী জয়লাভ করতে পারবেন না। জনগণের স্বার্থে অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও গণভোটে রায়ের পরও সরকার সংস্কার প্রস্তাবনাগুলো অস্বীকার করতে চায়। তিনি বলেন, যেসব প্রস্তাবে বিএনপি একমত ছিল, সেগুলোও এখন মানতে চায় না। বিএনপি সংস্কারের কোনো এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী নয় এবং এখন তারা পেছনে ফিরে যাওয়ার বাহানা খুঁজছে। তাঁর মতে, একপেশে ও একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে গণভোটে রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করলেই সংকটের সমাধান হবে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের পায়ের তলার মাটি সরে গেছে, তাই তারা আবোলতাবোল বলে জাতিকে ভুল বুঝিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। বিশেষ কমিটির নামে সংবিধান সংশোধনের অপচেষ্টা চলছে এবং জুলাই সনদের পরিপন্থী নতুন নতুন ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
সভায় আরও বক্তব্য প্রদান করেন জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), নূরুল ইসলাম বুলবুল, সেলিম উদ্দিন, জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য শিশির মনির, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, এবি পার্টির সেক্রেটারি আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের প্রেসিডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. হাসান নাসির, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান, ডিইউজের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান, ডিইউজের সভাপতি শহীদুল ইসলাম, আইনজীবী এএসএম শাহরিয়ার কবির এবং সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ও জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম প্রমুখ।