গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দেওয়া রায়কে পাশ কাটিয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটছে সরকার বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির শীর্ষ নেতাদের মতে, সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার সংবিধান সংশোধন করতে পারলেও সেই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এই প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে বরং রাজপথে আন্দোলন জোরদার করে সরকারকে অবস্থান বদলাতে বাধ্য করতে চায় জামায়াত। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এই তথ্য জানা গেছে।

জামায়াত নেতাদের দাবি, সংবিধানের ‘সংশোধন’ এবং ‘সংস্কার’—এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা এবং এদের এক করে দেখার সুযোগ নেই। তাঁদের মতে, গণভোটে জনগণের যে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, তা কেবল বিদ্যমান সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু ধারা সংশোধনের জন্য ছিল না; বরং জুলাই সনদে বর্ণিত সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য ছিল।

নেতৃবৃন্দের আশঙ্কা, সরকার সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারে। বিশেষ কমিটিতে অংশ নিলে সরকারের এই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া হবে—এই যুক্তিতেই তাঁরা কমিটিতে প্রতিনিধি দেননি। ফলে সংসদের পাশাপাশি রাজপথে কর্মসূচি জোরদার করে সরকারকে চাপে রাখতে চান তাঁরা।

তবে জামায়াত নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে, এসব কর্মসূচিকে আপাতত সরকার পতনের আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তাঁদের ভাষ্যমতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই সনদ কার্যকর করা এবং জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দাবিতে জনমত গড়ে তুলতেই তাঁরা মাঠে নেমেছেন। তবে এসব দাবি উপেক্ষা করা হলে কর্মসূচি আরও কঠোর করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ৬ অক্টোবর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সরকার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কমিটি গঠন করে নিজেদের মতো করে সংবিধান সংশোধনের চেষ্টা করছে। সেটি যাতে তারা করতে না পারে, সে জন্য মাঠের আন্দোলন জোরদার করতে চায় জামায়াত।”

পাশাপাশি গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন করে গণভোট আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত। গত ২৮ সেপ্টেম্বর এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে নতুন করে গণভোট আয়োজন প্রসঙ্গে আগের গণভোটের রায়ের সাংবিধানিক অবস্থান, একই বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নতুন গণভোটের প্রয়োজনীয়তা এবং এর আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

৬ অক্টোবর হামিদুর রহমান আযাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে নতুন করে গণভোট আয়োজনের কথা বলছে। এটি জাতির সঙ্গে প্রতারণা। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার সংবিধান সংশোধন করতে পারে, তবে সেটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।”

উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ রাষ্ট্রসংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে উল্লেখ ছিল, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। এই পরিষদ গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কারের কাজ শেষ করবে। সেই অনুযায়ী জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচিত সদস্যরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। তবে বিএনপি ও তাদের জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেননি, যার ফলে পরিষদটি গঠিত হয়নি।

এরই মধ্যে গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে ১২ সদস্যের একটি ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়, যার সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। এই কমিটির কাজ হলো সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য সুপারিশ তৈরি করে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেওয়া। সেপ্টেম্বর থেকে এই বিশেষ কমিটি জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করেছে। কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচজন প্রতিনিধির নাম চাওয়া হলেও জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো কোনো প্রতিনিধি দেয়নি। কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শেষে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্য রয়েছে তাঁদের।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গত ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “জাতীয় সংসদ সংবিধানসৃষ্ট প্রতিষ্ঠান। সংবিধানের মৌলিক পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে জনগণই চূড়ান্ত সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। গণভোটে জনগণ যে প্রক্রিয়া অনুমোদন করেছেন, সেটি পাশ কাটিয়ে বিকল্প কোনো প্রক্রিয়াকে জনগণের ম্যান্ডেট হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।”

জানতে চাইলে মিয়া গোলাম পরওয়ার ৬ অক্টোবর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সরকার ‘গণবিরোধী, আইনবিরোধী’ পথে সংবিধান সংশোধনের দিকে যাচ্ছে। জনগণের স্বার্থ ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হলে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায়ের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতেই বিরোধী দল লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। সরকার দাবি না মানলে ভবিষ্যতে মাঠের আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে। বিএনপি সরকার জল ঘোলা করে দাবি মেনে নেবে উল্লেখ করে জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, অতীতেও তারা এমনটি করেছিল।