রোমান পুরাণে জানুস এমন এক দেবতা, যাঁর দুটি মুখ। একটি মুখ অতীতের দিকে, অন্যটি ভবিষ্যতের দিকে। দরজা, প্রবেশপথ ও পরিবর্তনের এই দেবতার প্রতীকী তাৎপর্য হলো, কোনো রাষ্ট্রের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে একই সঙ্গে তার অতীতের দিকে তাকাতে হয়।

বাংলাদেশের সংবিধান দিবসও আমাদের সামনে তেমনই একটি দ্বিমুখী আয়না তুলে ধরে। একদিকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা–উত্তর গণপরিষদ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। অন্যদিকে সংবিধানের নামে ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ ইতিহাস।

খুব কম দেশেই বাংলাদেশের মতো যেখানে রাজনীতিতে সংবিধান এত গুরুত্বপূর্ণ অথচ রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে সংবিধান দিবস এত অনুজ্জ্বল কেন? যে দলিলকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষ নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করতে চায়, সেই দলিলের জন্মদিনই কেন আমাদের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল না। এই প্রশ্ন নিছক একটি দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে নয়, এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংস্কৃতি–সংশ্লিষ্ট এক গভীর রাজনৈতিক প্যারাডক্স।

বাংলাদেশের সংবিধান দিবস সরকারি স্বীকৃতি পায় ২০২২ সালে, সংবিধান গৃহীত হওয়ার ৫০তম বছরে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদ সংবিধান গ্রহণ করে। ১৬ ডিসেম্বর তা কার্যকর হয় অর্থাৎ, স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্র তার আত্মপরিচয় নির্মাণ করেছিল একটি লিখিত সংবিধানের মধ্য দিয়ে, সেই রাষ্ট্রের সংবিধান দিবসকে সরকারি স্বীকৃতি দিতে লেগে যায় প্রায় অর্ধশতাব্দী।

এই বিলম্বের তাৎপর্য কেবল কালপঞ্জিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সংবিধানকে আমরা কি রাষ্ট্রের অভিন্ন অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করেছি, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যবহারের একটি বৈধতাদানকারী দলিল হিসেবে দেখেছি?

সংবিধান কোনো নির্বাচনী ইশতেহার নয়, কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা প্রচারপত্রও নয়। এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংগঠিত করে, সেই ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে এবং নাগরিকের অধিকারকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলে। সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের অর্থ তাই কেবল তার কয়েকটি অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করা নয়; বরং ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী দলে থাকুক, প্রত্যেক রাজনৈতিক শক্তির জন্য একই সাংবিধানিক মানদণ্ড মেনে চলা।

স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংবিধান প্রায়ই হয়ে উঠেছে পারস্পরিক বৈধতা অস্বীকারের হাতিয়ার। এক পক্ষ সংবিধান রক্ষার দাবি করে, অন্য পক্ষ সংবিধান পরিবর্তনের দাবি তোলে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সংবিধানের ব্যাখ্যা, সংশোধন এবং রাজনৈতিক ব্যবহারেও বদল আসে। ফলে সংবিধান নাগরিকের অভিন্ন আশ্রয় হয়ে ওঠার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে অবস্থান করে।

এখানে সাংবিধানিকতাবাদ বা কনস্টিটিউশনালিজম ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান থাকা আর সংবিধান মেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। সাংবিধানিকতাবাদের মূলকথা হলো, সরকার সংবিধান অনুযায়ী চলবে এবং কোনো অবস্থাতেই সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হবে না। সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও তার সব সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো, নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা এবং সরকারের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সাংবিধানিকতাবাদের উদ্দেশ্য।

আমেরিকান সাংবিধানিক চিন্তার অন্যতম ভিত্তি দ্য ফেডারেলিস্ট পেপার্স-এর ৫১ নম্বর প্রবন্ধে জেমস ম্যাডিসন লিখেছিলেন, “মানুষ যদি দেবদূত হতো, তাহলে সরকারের প্রয়োজন হতো না।” তাঁর যুক্তির মূলকথা, সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন, কারণ ক্ষমতাধারীরাও ভুল করতে পারেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন।

ম্যাডিসনের এই পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সংবিধান দিবসের মূল শিক্ষা হওয়া উচিত—কোনো সরকার, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা জনপ্রিয় নেতা সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন। সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার অনুমতিপত্র নয়, একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিকের সুরক্ষাকবচ। অতএব, সংবিধান দিবসের প্রয়োজনীয়তা রাষ্ট্রকে তার নিজের কাছেই জবাবদিহির মুখোমুখি করা। এই দিনটি যদি কেবল সরকারি বক্তৃতা, আলোচনা সভা কিংবা আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার সাংবিধানিক তাৎপর্য অধরাই থেকে যাবে।

২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ও ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস পালিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। আলোচনায় উঠে এসেছে ক্ষমতার বিভাজন, চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সেস আইনের শাসন এবং মৌলিক অধিকারের সুরক্ষার মতো বিষয়।

এই আয়োজন নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। অন্য দেশের (আমেরিকার সংবিধান প্রাচীন সংবিধানের একটি) সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা থেকে শেখার মধ্যে কোনো হীনম্মন্যতা নেই, বরং সেটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতার লক্ষণ। কিন্তু এখানেই আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আসে, আর সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের সংবিধান দিবসকে জনপরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে একই ধরনের রাষ্ট্রীয় আগ্রহ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ কতটা দৃশ্যমান।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ১৭৮৭ সালে প্রণীত হয়েছিল। দীর্ঘ সাংবিধানিক ইতিহাসে দেশটি গৃহযুদ্ধ, বর্ণবৈষম্য, নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার–সংক্রান্ত সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। তার সাংবিধানিক ঐতিহ্যকে তাই কোনো ত্রুটিহীন গণতন্ত্রের গল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এর শিক্ষণীয় দিক হলো, সংবিধানের অর্থ ও প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক, সংশোধন, বিচারিক পর্যালোচনা এবং নাগরিক আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

ব্রিটিশ সাংবিধানিক অভিজ্ঞতাও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক। যুক্তরাজ্যের কোনো একক সংকলিত লিখিত সংবিধান নেই; তার সাংবিধানিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে আইন, বিচারিক সিদ্ধান্ত, প্রথা এবং সাংবিধানিক রীতিনীতির সমন্বয়ে। ওয়াল্টার ব্যাজট তাঁর দ্য ইংলিশ কনস্টিটিউশন বইয়ে সংবিধানের আনুষ্ঠানিক কাঠামো ও বাস্তবে কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যকার পার্থক্য বিশ্লেষণ করেছেন।

তাঁর পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কেবল আইনি বিধান দিয়ে চলে না। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি রাজনৈতিক আচরণ, জনসম্মতি এবং দীর্ঘদিনের রীতিও তাদের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের সমস্যা এখানেই। আমরা সংবিধানের অনুচ্ছেদ নিয়ে তর্ক করি, কিন্তু সাংবিধানিক রীতিনীতি ও রাজনৈতিক সংযমের প্রশ্নে প্রায়ই নীরব থাকি। সংবিধানের অক্ষরকে সামনে রেখে তার অন্তর্নিহিত চেতনাকে উপেক্ষা করা হলে সাংবিধানিকতার বাহ্যিক কাঠামো টিকে থাকলেও তার প্রাণশক্তি ক্ষয় হতে পারে।

সাংবিধানিক সংস্কৃতি বা কনস্টিটিউশনাল কালচার বলতে বোঝায়, সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আচরণের অংশ হয়ে ওঠা। সংবিধান শুধু আইনজীবী, বিচারক কিংবা রাজনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের সঙ্গে যুক্ত।

একটি দেশে সংবিধান নিয়ে বড় বড় আলোচনা হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যদি ক্ষমতায় গিয়ে এক রকম আচরণ করে এবং বিরোধী দলে গিয়ে তার বিপরীত দাবি তোলে, তাহলে সেখানে সুস্থ সাংবিধানিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। ব্রিটিশ সাংবিধানিক চিন্তাবিদ ওয়াল্টার ব্যাজটের আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নিয়মের পাশাপাশি রাজনৈতিক আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতিও সংবিধানকে কার্যকর করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই উপলব্ধি জরুরি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রের সংবিধান শুধু আইনজ্ঞদের রচিত একটি দলিল নয়। এর পেছনে রয়েছে আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম, রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং বৈষম্য ও বঞ্চনার অবসানের প্রত্যাশা। ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে।

কিন্তু এই দলিল যদি আইনজীবী, বিচারক, সংসদ সদস্য কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এর সামাজিক ভিত্তি দুর্বল থেকে যাবে। একজন কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নারী কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে জানতে হবে—সংবিধান তাঁর জীবনের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত। তাঁর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমতার অধিকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করার ভিত্তির সঙ্গে সংবিধানের সম্পর্ক কোথায়।

সংবিধান দিবসকে তাই নাগরিক শিক্ষার একটি জাতীয় উপলক্ষে পরিণত করা প্রয়োজন। বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবিধান পাঠ, সংসদে বিশেষ আলোচনা, গণমাধ্যমে সহজ ভাষায় সাংবিধানিক অধিকার ব্যাখ্যা এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্মুক্ত সংলাপের আয়োজন হতে পারে এর বাস্তব সূচনা।

সাংবিধানিক দেশপ্রেম বা কনস্টিটিউশনাল প্যাট্রিয়টিজম ধারণাটি আমাদের আরেকটি মৌলিক সংকট বুঝতে সাহায্য করে। জার্মান দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক ইয়ুর্গেন হাবারমাসের রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত এ ধারণার মূলকথা হলো, রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আনুগত্য কোনো নির্দিষ্ট দল, নেতা, জাতিগত পরিচয় কিংবা ক্ষমতাসীন মতাদর্শের প্রতি আনুগত্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং গণতান্ত্রিক নীতি, মৌলিক অধিকার এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।

এই ধারণা বাংলাদেশের জন্য দারুণ প্রাসঙ্গিক। সংবিধানের প্রতি আনুগত্য যদি ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্যের সমার্থক হয়ে যায়, তবে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সাংবিধানিক আনুগত্যেরও পরিবর্তন ঘটবে। আবার বিরোধী দলে থাকাকালে যে দল সংবিধানের কোনো বিধানের সমালোচনা করে, ক্ষমতায় গিয়ে সেই বিধানকেই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করলে সাংবিধানিক দেশপ্রেমের জায়গায় দলীয় সুবিধাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়।

সংবিধানের প্রতি প্রকৃত আনুগত্যের অর্থ অবশ্য সংবিধানের প্রতিটি বিধানকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করা নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে সংবিধান সংশোধনের দাবি তোলা, তার ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক করা কিংবা কোনো বিধানের নৈতিক ও রাজনৈতিক যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ করাও বৈধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ। কার্যকর রাজনৈতিক সক্রিয়তার প্রকাশ। কিন্তু সেই বিতর্ক পরিচালিত হতে হবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মান রেখে।

সংবিধান নিয়ে আমাদের আরেকটি রাজনৈতিক প্যারাডক্স আছে। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। অথচ দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রমই বর্তমানে নিষিদ্ধ। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি জটিল প্রশ্ন রাখে, সংবিধানের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, রাজনৈতিক দলের জবাবদিহি এবং নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত হবে?

এখানে দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, কোনো দলের ঐতিহাসিক অবদান তাকে ভবিষ্যতের জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি দেয় না। দ্বিতীয়ত, কোনো দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকাও আইনের শাসন, যথাযথ প্রক্রিয়া এবং মৌলিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনীয়তা বিলুপ্ত করে না। ব্যক্তি বা দলের দায় নির্ধারণ করতে হবে প্রযোজ্য আইন ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায়। ন্যায্যতার ভিত্তিতে।

সংবিধান দিবসের তাৎপর্য হলো, এই দুই নীতিকে একই সঙ্গে ধারণ করা। ইতিহাসকে অস্বীকার না করা এবং ইতিহাসের দোহাই দিয়ে জবাবদিহি এড়িয়ে না যাওয়া। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকারকেও নিজের অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করা সাংবিধানিক সংস্কৃতির অন্যতম পরীক্ষা।

বাংলাদেশের সংবিধান দিবসকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে অর্থবহ করে তুলতে কয়েকটি উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, ৪ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে নিয়মিত রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে সংবিধান নিয়ে আলোচনা কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংসদ, বিশ্ববিদ্যালয়, আইনজীবী সমিতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের অংশগ্রহণে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করা যেতে পারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন শুরু হবে আগামী ৯ নভেম্বর অথচ এটি ৪ তারিখ হলে সংবিধান দিবস নিয়ে সংসদে আইন প্রণেতাদের আলোচনা ও উদ্‌যাপন হতে পারত।

দ্বিতীয়ত, নাগরিকদের জন্য সহজবোধ্য সংবিধান পাঠের ব্যবস্থা করতে হবে। সংবিধানের ভাষা আইনি ও আনুষ্ঠানিক হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সব বিধানের তাৎপর্য অনুধাবন করা সহজ নয়। সহজ ভাষায় ব্যাখ্যামূলক প্রকাশনা, বাংলা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ভাষায় নাগরিক শিক্ষা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদের পরিচিতি এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।

তৃতীয়ত, সংবিধান দিবসকে আত্মসমালোচনার উপলক্ষ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্যায়ন করতে হবে, সাংবিধানিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে, ক্ষমতার বিভাজন কতটা কার্যকর, বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নাগরিকের অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে। সংবিধান দিবসের সাফল্য সরকারি অনুষ্ঠান কত বড় হলো, তার ওপর নয়; বরং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে কতটা অগ্রগতি হলো, তার ওপর নির্ভর করা উচিত।

সবশেষে সংবিধানকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে রাখার অর্থ সংবিধানকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা নয়। বরং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে সংবিধান নিয়ে বিতর্ক হবে, কিন্তু সংবিধানের নামে প্রতিপক্ষের নাগরিক মর্যাদা অস্বীকার করা হবে না; ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, কিন্তু কোনো দল বা নেতাকে রাষ্ট্রের সমার্থক মনে করা হবে না।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ এই বিধানটি কেবল সাংবিধানিক অলংকার নয়। এটি ক্ষমতার উৎস ও সীমা—দুটিই নির্ধারণ করে। জনগণ ক্ষমতার মালিক; সরকার সেই ক্ষমতার স্থায়ী মালিক নয়। সংবিধান দিবসে এই মৌলিক সত্যটিই নতুন করে উচ্চারিত হওয়া দরকার।

জানুসের দুটি মুখের মতো বাংলাদেশেরও অতীত ও ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর প্রয়োজন আছে। অতীত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি সংবিধান অর্জনের জন্য এই ভূখণ্ডের মানুষকে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। ভবিষ্যৎ আমাদের প্রশ্ন করে, সেই সংবিধান কি নাগরিকের অধিকার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের জীবন্ত ভিত্তি হয়ে উঠতে পেরেছে? যে রাষ্ট্র সংবিধানকে রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান দলিল বলে দাবি করে, সেই রাষ্ট্রের সংবিধান দিবস পালনে অনীহা শুধু আনুষ্ঠানিকতার ঘাটতি নয়; এটি তার সাংবিধানিক আত্মপরিচয়েরই সংকট।

৪ নভেম্বর তাই কেবল সংবিধান গৃহীত হওয়ার দিন নয়। এটি রাষ্ট্রের নিজের কাছে প্রশ্ন রাখার দিন—সংবিধান কি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার ও ক্ষমতায় থাকার যুক্তি, নাকি ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ রাখারও অঙ্গীকার? আমরা যদি এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে না শিখি, তাহলে সংবিধান নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক উচ্চারণ যতই উচ্চকিত হোক, সাংবিধানিক সংস্কৃতি তত দিন নীরবই থেকে যাবে।

এম এম খালেকুজ্জামান
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

মতামত লেখকের নিজস্ব