নওগাঁর মহাদেবপুরে এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর পিকআপ ভ্যান থেকে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ছিনতাইয়ের রহস্য মাত্র আট ঘণ্টার মধ্যে উদঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। এই অপরাধের সাথে জড়িত রাজনৈতিক পদধারী এক নেতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া ৯ লাখ ৩ হাজার টাকার পুরোটাই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেল ৩টায় পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। পুলিশ সুপার জানান, মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দিবাগত রাত পৌনে ৮টার দিকে নওগাঁ-মহাদেবপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের মহাদেবপুর উপজেলার চৌদ্দমাইল ব্রিজ এলাকায় এই ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ সুপার মহোদয়ের তাৎক্ষণিক নির্দেশনায় ওই রাতেই ডিবি (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ) এর একটি দল এবং থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযুক্তদের আটক করে।
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, তাদের মধ্যে একজন হলেন উপজেলার ঈশ্বরলক্ষীপুর গ্রামের মৃত ইয়াদ আলীর ছেলে এবং বর্তমানে উপজেলা সদরের বাগানবাড়ি এলাকার বাসিন্দা রবিন (২৫)। তিনি উপজেলা কৃষক দলের ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক। এ ছাড়া রামচন্দ্রপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে মুন্না (২৪) এবং এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত ডিমজাউন গ্রামের আমজাদ হোসেনের ছেলে পিকআপ চালক সোহেল রানা (২৫)-কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ আরও জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত মুন্নার বিরুদ্ধে পূর্বে একটি চুরি মামলাসহ মোট দুটি মামলা রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার রাঘববাড়িয়া গ্রামের আব্দুল বারি মণ্ডলের ছেলে আব্দুল আলিম (৩৪) মহাদেবপুর উপজেলার সরকারি গোডাউনের পাশে দোকান ভাড়া নিয়ে ভাঙারি ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ঘটনার দিন ওই ব্যবসার ম্যানেজার এবং ভুক্তভোগীর চাচাতো ভাই মজনু মিয়া (৩৫) ও পিকআপ চালক সোহেল রানা বগুড়া থেকে মালামাল বিক্রির ৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা নিয়ে মহাদেবপুরে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে চৌদ্দমাইল ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে তাদের পিকআপটি হঠাৎ বিকল হয়ে যায়।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীরা মোটরসাইকেলে করে সেখানে arrives এবং চালক সোহেলকে সামান্য ও ম্যানেজার মজনু মিয়াকে ব্যাপক মারধর করে নগদ ৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে পথচারীরা আহতদের উদ্ধার করে মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। তবে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ম্যানেজার মজনুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নওগাঁ সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ঘটনাটি পুলিশের নজরে আসার পরপরই পুলিশ সুপার দ্রুত রহস্য উদঘাটনের নির্দেশ দেন। মহাদেবপুর থানা পুলিশ ও নওহাটা পুলিশ ফাঁড়ির পাশাপাশি জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি এবং সংগৃহীত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ রাতেই অভিযান শুরু করে। প্রথমে রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাড়ি থেকে মুন্নাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার ঘর থেকে ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে মুন্নার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলা সদরের একটি ভাড়া বাসা থেকে রবিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই সময় রবিনের বাসা থেকে আরও ৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা এবং ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। সর্বশেষ তাদের উভয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নওগাঁ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভাঙারি পিকআপের চালক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, “প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ভাঙারি পিকআপের চালক সোহেল ও মুন্না এই ছিনতাইয়ের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন এবং রবিন প্রধান ভূমিকায় অংশ নেন। তারা বিগত এক সপ্তাহ ধরে এই ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে আসছিলেন।” তিনি আরও বলেন, “সড়কে যেকোনো ধরনের অপরাধ, বিশেষ করে ছিনতাই ও ডাকাতি কঠোর হস্তে দমন করতে জেলা পুলিশ বদ্ধপরিকর।”
এদিকে অভিযুক্তদের দলীয় পরিচয়ের বিষয়ে উপজেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মতি জানান, “অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় উপজেলা কৃষক দলের ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রবিনকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে।” আইনি প্রক্রিয়া শেষে গ্রেপ্তারকৃত তিনজনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।