নিউজিল্যান্ড সফরের শুরুটা একেবারেই সুখকর হলো না রোহিত শর্মার। দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় পর ওয়ানডেতে রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে ফিরতে হয়েছে এই ভারতীয় ওপেনারকে। তবে সতীর্থের এমন হতাশার দিনে নতুন এক ইতিহাস রচনা করলেন বিরাট কোহলি। ওয়ানডে ক্রিকেটে তিন নম্বর পজিশনে ব্যাটিং করে বিশ্বের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ১৩ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন ভারতের সাবেক এই অধিনায়ক। এই অনন্য কীর্তির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি রিকি পন্টিংকেও অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছেন তিনি।

বুধবার (৪ নভেম্বর) নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে এই বিশ্বরেকর্ড গড়েন কোহলি। অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে তিন নম্বরে ব্যাটিং করতে নেমে মাত্র ১২ রান করেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম খোদাই করেন ৩৭ বছর বয়সী এই তারকা। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এর আগে কোনো ব্যাটার নির্দিষ্ট এই ব্যাটিং পজিশনে ১৩ হাজার রান করতে সক্ষম হননি।

ম্যাচের আগে তিন নম্বর পজিশনে কোহলির মোট রান ছিল ১২ হাজার ৯৮৮। নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে তাঁর প্রয়োজন ছিল আর মাত্র ১২ রান। সেই অপেক্ষাও খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। নিজের ১৩তম বলে ১২তম রানটি নিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাইলফলকে পৌঁছে যান তিনি। ভারতের ইনিংসের সপ্তম ওভারে আসে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি।

ওয়ানডেতে তিন নম্বরে সর্বোচ্চ রানের তালিকায় আগে থেকেই শীর্ষস্থানে ছিলেন কোহলি। এবার সেই অবস্থানকে আরও সুসংহত করলেন ভারতীয় তারকা। এই তালিকায় তাঁর ঠিক পরেই রয়েছেন রিকি পন্টিং, যিনি এই পজিশনে করেছেন ১২ হাজার ৬৬২ রান। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক পন্টিং ৩৩০ ইনিংসে এই রান সংগ্রহ করেছিলেন। অন্যদিকে, কোহলি মাত্র ২৫১তম ইনিংসেই ১৩ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।

এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি কুমার সাঙ্গাকারা। তিন নম্বরে তাঁর সংগ্রহ ৯ হাজার ৭৪৭ রান। এরপর রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যাক ক্যালিস (৭৭৭৪) ও নিউজিল্যান্ডের কেন উইলিয়ামসন (৬৫০৪)।

বিশ্ব ক্রিকেটে তিন নম্বরে ব্যাট করে ১০ হাজারের বেশি রান করার বিরল কীর্তি কেবল কোহলি ও পন্টিংয়েরই রয়েছে। তবে ধারাবাহিকতা এবং সেঞ্চুরির সংখ্যার বিচারে অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তির চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন কোহলি। এই পজিশনে তাঁর সেঞ্চুরির সংখ্যা ৪৮টি। ওয়ানডে ইতিহাসে তিন নম্বরে নেমে এত শতক আর কোনো ব্যাটার করতে পারেননি। অন্যদিকে একই পজিশনে পন্টিংয়ের সেঞ্চুরি ২৯টি। সব পজিশন মিলিয়ে কোহলির ওয়ানডে সেঞ্চুরি ৫৫টি, যা এই সংস্করণের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর ধীরে ধীরে ভারতের ব্যাটিং লাইনআপের অন্যতম প্রধান ভরসায় পরিণত হন কোহলি। বিশেষ করে তিন নম্বরে ব্যাট করে তাঁর ধারাবাহিক রান সংগ্রহ ভারতকে অসংখ্য ম্যাচে জয় এনে দিয়েছে। লক্ষ্য তাড়ায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণেও আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন এই ডানহাতি ব্যাটার।

এদিকে কোহলি যখন ইতিহাস গড়ছেন, তখন সম্পূর্ণ বিপরীত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন রোহিত শর্মা। নিউজিল্যান্ডের দেওয়া ১৮৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রথম ওভারেই সাজঘরে ফেরেন তিনি। কাইল জেমিসনের করা ওভারের শেষ বলে মিডঅফে ক্যাচ দেন রোহিত। সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে দারুণ দক্ষতায় ক্যাচটি নেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার। ছয় বল খেলেও কোনো রান করতে পারেননি ভারতীয় ওপেনার।

ওয়ানডেতে তিন বছরের বেশি সময় পর শূন্য রানে আউট হলেন রোহিত। এর আগে সর্বশেষ ২০২৩ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চেন্নাইয়ের ম্যাচে রানের খাতা খুলতে পারেননি তিনি। সেবারও ছয় বল খেলে শূন্য রানে ফিরেছিলেন। জশ হ্যাজলউডের বলে এলবিডব্লিউ হয়েছিলেন ভারতীয় ওপেনার। এরপর টানা ৩৯ ইনিংসে আর কোনো ডাক ছিল না তাঁর।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এটিই রোহিতের প্রথম ওয়ানডে ডাক। একই সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের মাটিতেও এই সংস্করণে প্রথমবার শূন্য রানে আউট হলেন তিনি। সব মিলিয়ে ওয়ানডেতে ১৭তমবার রানের খাতা খুলতে ব্যর্থ হলেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক।

ভারতীয় ক্রিকেটারদের মধ্যে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ২০ বার শূন্য রানে আউট হয়েছেন শচীন টেন্ডুলকার। কোহলি ও জাভাগাল শ্রীনাথের রয়েছে ১৯টি করে ডাক। অনিল কুম্বলে ও যুবরাজ সিংয়ের ১৮টি করে। আর ১৭টি ডাক নিয়ে হরভজন সিংয়ের পাশে এখন দাঁড়িয়েছেন রোহিত।

তবে ব্যাট হাতে ব্যর্থ হলেও ফিল্ডিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন রোহিত। নিউজিল্যান্ডের ইনিংসে দারুণ এক থ্রোতে ড্যারিল মিচেলকে রানআউট করেন তিনি। ২৮ রান করা মিচেলকে ফেরাতে মিডউইকেট থেকে তাঁর থ্রো ধরে উইকেট ভেঙে দেন লোকেশ রাহুল।

এর আগে টস জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন ভারতীয় অধিনায়ক শুভমান গিল। পেসারদের দাপটে ৪০ দশমিক ২ ওভারে ১৮৫ রানে অলআউট হয় নিউজিল্যান্ড। চার উইকেট নেন আর্শদীপ সিং। গুরনুর ব্রার তিনটি এবং অংশুল কাম্বোজ দুটি উইকেট শিকার করেন।

নিউজিল্যান্ডের পক্ষে সর্বোচ্চ ৩৮ রান করেন টিম সেইফার্ট। গ্লেন ফিলিপস করেন ৩০ রান। শেষ দিকে ব্লেয়ার টিকনারের ২৩ বলে ৩৪ রানের ইনিংসে কিছুটা লড়াইয়ের পুঁজি পায় স্বাগতিকরা।

জবাবে শুরুতেই রোহিতকে হারালেও অধিনায়ক শুভমান গিলকে নিয়ে ইনিংস সামলান কোহলি। মাত্র এক রানে প্রথম উইকেট হারানোর পর দ্বিতীয় উইকেটে শতরানের জুটি গড়ে ভারতকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেন দুজন।

আগামী ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ সামনে রেখে ভারতীয় দলের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে রোহিত ও কোহলির। দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারই এখন শুধু ওয়ানডে সংস্করণে খেলছেন। ফলে বিশ্বকাপের আগে প্রতিটি সিরিজই তাঁদের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নিউজিল্যান্ড সফরের প্রথম ম্যাচে দুই তারকার অভিজ্ঞতা অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। রোহিতের জন্য দিনটি হতাশার হলেও ক্যারিয়ারের আরও একটি ঐতিহাসিক অর্জনে উজ্জ্বল করে রাখলেন কোহলি।