লোকেশ রাহুলের ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস এবং রোহিত শর্মার বিশ্বরেকর্ডের সাক্ষী হয়েও শেষ হাসি হাসল না ভারত। মাত্র ৪ রানে ২ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়লেও স্বাগতিকরা ৩৫১ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। তবে সেই বিশাল লক্ষ্য তাড়া করে শাই হোপের অপরাজিত ১৬২ রানের এক অসাধারণ ব্যাটিং প্রদর্শনীতে নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সফল রানতাড়ার রেকর্ড গড়ে জয় ছিনিয়ে নিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
নিউ চণ্ডীগড়ে শনিবার অনুষ্ঠিত তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে ম্যাচে ভারতের ৭ উইকেটে ৩৫১ রানের জবাবে ৪৮.২ ওভারে ৫ উইকেটে ৩৫২ রান করে জয় পায় ক্যারিবীয় দল। ১০ বল হাতে রেখেই ৫ উইকেটের এই জয় নিশ্চিত করে তারা হোয়াইটওয়াশ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেল। যদিও তিন ম্যাচের সিরিজটি ২-১ ব্যবধানে জিতে নিয়েছে ভারত।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য এই জয়টি ছিল ঐতিহাসিক। এর আগে ২০১৯ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৩১/৫ ছিল তাদের সর্বোচ্চ সফল রানতাড়া। এবার ভারতের মাটিতে ৩৫২ রান তুলে সেই পুরনো রেকর্ডটি নতুন করে লিখল তারা।
বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে ৪.১ ওভারে ৪১ রানেই প্রথম ধাক্কা খায় তারা। মোহাম্মদ সিরাজের বলে ৭ বলে ১০ রান করা জন ক্যাম্পবেল বোল্ড হয়ে ফেরেন।
এরপরই ভারতীয় বোলারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ান শাই হোপ এবং আমির জাঙ্গু। দ্বিতীয় উইকেটে তারা ৯৯ বলে ১০৯ রানের একটি গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন। জাঙ্গু ৫৬ বলে ৫টি চার ও ১টি ছক্কায় ৬৭ রান করেন। তবে ২১তম ওভারে বিরাট কোহলির দুর্দান্ত থ্রোতে রানআউট হয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। জাঙ্গু ফেরার সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ছিল ১৫০/২, যা তাদের জন্য বেশ সুবিধাজনক অবস্থান ছিল।
জাঙ্গু বিদায় নিলেও এক প্রান্ত আগলে রেখে লড়াই চালিয়ে যান হোপ। শেরফেন রাদারফোর্ড ২৫ বলে ২৪ রান করে আউট হলে স্কোরবোর্ডে দেখা যায় ২০৬/৩। এরপর কিমো পলের সঙ্গে জুটি বেঁধে আবারও ইনিংসের গতি বাড়ান ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক। এই জুটিতে আরও ৬৫ রান যোগ হয়। পল ৩৫ বলে ৫টি চারসহ ৪৪ রান করে বিদায় নেন।
এদিকে হোপ ততক্ষণে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছে গেছেন। এটি তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ২১তম শতক এবং ভারতের বিপক্ষে পঞ্চম। উল্লেখ্য, গুয়াহাটিতে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচেও তিনি ১০৪ রান করেছিলেন।
৪৪তম ওভারে ম্যাথু ফোর্ড আউট হলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর দাঁড়ায় ২৯০/৫। জয়ের জন্য তখন ৩৯ বলে ৬২ রান প্রয়োজন ছিল। এই মুহূর্তে ম্যাচে ফেরার সুযোগ পেয়েছিল ভারত। কিন্তু হোপের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন।
গুদাকেশ মোতিকে সঙ্গে নিয়ে শেষ মুহূর্তের চাপ তিনি উল্টো ভারতের ওপর চাপিয়ে দেন। ষষ্ঠ উইকেটে মাত্র ২৯ বলে অবিচ্ছিন্ন ৬২ রানের জুটি গড়ে ম্যাচ শেষ করেন তারা। শেষ পর্যন্ত ১৪৩ বলে ১৭টি চার ও ৩টি ছক্কায় ১৬২ রানে অপরাজিত থাকেন হোপ। মোতি ১৪ বলে ২টি চার ও ১টি ছক্কায় ১৯ রানে অপরাজিত থাকেন। ৪৮.২ ওভারেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
এর আগে টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া ভারতের শুরুটা ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। তৃতীয় ওভারের তৃতীয় বলে জেইডেন সিলসের বলে আউট হন শুভমান গিল। ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা ৬ বলে মাত্র ১ রান করে বিদায় নেন। ঠিক তার পরের বলেই সিলসের বলে শূন্য রানেই বোল্ড হয়ে ফেরেন বিরাট কোহলি। স্কোর তখন মাত্র ৪/২।
এই চরম বিপর্যয় থেকে ভারতকে টেনে তোলেন রোহিত শর্মা ও ঋতুরাজ গায়কোয়াড়। তৃতীয় উইকেটে তাদের ১৩৭ রানের বিশাল জুটি স্বাগতিকদের ম্যাচে টিকিয়ে রাখে। রোহিত সেঞ্চুরির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। ৮৫ বলে ১০টি চার ও ৩টি ছক্কায় ৯২ রান করে তিনি কিমো পলের শিকার হন। তবে রান তাড়া করার আগেই তিনি গড়ে ফেলেন এক বিশ্বরেকর্ড। ওপেনার হিসেবে ১০ হাজার ওয়ানডে রান পূর্ণ করতে রোহিতের লেগেছে মাত্র ২০২ ইনিংস। এর আগে ২০০৪ সালে শচীন টেন্ডুলকার ২১৪ ইনিংসে এই মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন।
অন্যদিকে ঋতুরাজ গায়কোয়াড় ৬৯ বলে ৫৭ রান করেন, যেখানে ছিল ১টি চার ও ৪টি ছক্কা। ২৮.৫ ওভারে ঋতুরাজ আউট হলে ভারতের স্কোর হয় ১৬০/৪। এরপর ইনিংসের দায়িত্ব নেন লোকেশ রাহুল।
প্রথমে পরিস্থিতি বুঝে সতর্ক ব্যাটিং করলেও পরে রীতিমতো ঝড় তোলেন এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। মাত্র ৮০ বলে পূর্ণ করেন তার নবম ওয়ানডে শতক। শেষ পর্যন্ত ৮৭ বলে ১০টি চার ও ৬টি ছক্কায় ১২৯ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। এই ইনিংসের মাধ্যমে আরেকটি রেকর্ড নিজের নামে করেন রাহুল। পাঁচ নম্বরে ব্যাটিং করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কোনো ভারতীয়র সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহের রেকর্ড এখন তার (১২৯ রান), যা ২০০৫ সালে কলম্বোয় যুবরাজ সিংয়ের ১১০ রানের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন।
নমন ধীরের ২১ বলে ৩০ এবং শেষদিকে আনশুল কাম্বোজের ৯ বলে ১৭ রানের সহায়তায় ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ৩৫১ রানে পৌঁছায় ভারত। বিশেষ করে শেষ ১০ ওভারেই তারা ১০৫ রান সংগ্রহ করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে জেইডেন সিলস ৬২ রানে ৩ উইকেট এবং কিমো পল ৭১ রানে ২ উইকেট নেন।