দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত নটর ডেম কলেজ। প্রতি বছর সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসএসসিতে অসাধারণ ফলাফল করা মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ হয়ে থাকে এই কলেজ। কঠোর মেধা যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাছাই করা শিক্ষার্থীরা এখানে পড়ার সুযোগ পান। তবে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নিয়ে ভর্তি হওয়া সত্ত্বেও কলেজটির ৩৮ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
এর পাশাপাশি আরও ১৬ জন শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করা সত্ত্বেও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। ফলে অকৃতকার্য এবং অনুপস্থিত মিলিয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে।
কলেজের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের জীবনযাপন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এক অভিভাবক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অভিভাবক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘রাজধানীর নামকরা এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক ছাত্র নিয়মিত ধূমপানের পাশাপাশি মাদকে আসক্ত। এ কারণে প্রতিবছর অনেকে শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর অনেক উদাহরণ থাকলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে উদাসীন।’
চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় নটর ডেম কলেজ থেকে মোট ৩ হাজার ২৫৬ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ২২৯ জন জিপিএ ৫ অর্জন করেছেন। অন্যদিকে, যারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিলেন এবং কেউ কেউ দেশের বাইরে থাকায় পরীক্ষায় বসতে পারেননি।
নটর ডেম কলেজে ভর্তির প্রক্রিয়া অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। সাধারণত বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৫, বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ ৪ এবং মানবিক বিভাগে জিপিএ ৩ পাওয়া শিক্ষার্থীরা আবেদনের সুযোগ পান। আবেদনকারীদের মধ্য থেকে জিপিএ এবং লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মৌখিক পরীক্ষার জন্য বাছাই করা হয়। বিজ্ঞান বিভাগের বাংলা মাধ্যম থেকে ১৯০০ জন এবং ইংরেজি বিভাগ থেকে ৪০০ জনকে নির্বাচিত করা হয়। মানবিক বিভাগ থেকে ৬০০ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ৮৫০ জন শিক্ষার্থী মৌখিক পরীক্ষার ডাক পান। এরপর এসএসসির জিপিএ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের সমন্বয়ে চূড়ান্তভাবে শিক্ষার্থীদের মনোনীত করা হয়।
ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান বিভাগে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি উচ্চতর গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিষয়ে প্রশ্ন থাকে। মানবিক বিভাগে বাংলা, ইংরেজি, আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) ও সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রশ্ন করা হয়। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের জন্য বাংলা, ইংরেজি, হিসাববিজ্ঞান, আইসিটি ও সাধারণ জ্ঞান বিষয়ে প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়।
শিক্ষাগত উৎকর্ষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনে বিশেষ গুরুত্ব দেয় নটর ডেম কলেজ। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদর্শনের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ ও সমন্বিত বিকাশ। এখানে কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ নয়, বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিপক্বতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়। এমনকি ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতেই ধূমপায়ী শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করা হয়। তবে এবারের ফলাফলে দেখা গেছে, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৮ জনই শুধু আইসিটি বিষয়ে ফেল করেছেন।
এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কলেজগুলোতে নিয়মিত ক্লাস হয় না, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসে না, প্রতিষ্ঠানে শিখন উপকরণের ঘাটতি থাকে। এসব কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিখন ঘাটতি লক্ষ করা যায়। কিন্তু রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নটর ডেম কলেজে এমন ফল প্রত্যাশিত নয়। এত শিক্ষার্থী ফেল করার দায় অবশ্যই কলেজ কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। শুধু আইসিটিতে ২৮ জন ফেল করা আরও আশঙ্কাজনক।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘চলতি বছর অনেক ভালো মানের কলেজে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কেন এত ফেল করল তা নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার।’
এ বিষয়ে নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ড. ফাদার হেমন্ত পিওউস রোজারিও মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘কলেজে লেখাপড়ার মানের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয় না। নিয়মের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে সিলেবাস শেষ করা হয়।’
শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ভর্তি হয়েছে। অনেকে পার্বত্য এলাকার। পাঠদান চলাকালে এই ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থাকলেও বাড়িতে গেলে সেই তত্ত্বাবধানের সুযোগ থাকে না। তাদের অভিভাবকরা হয়তো সন্তানদের তেমন নার্সিং করেন না। তাই এবার ফেলের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।’