বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাবে চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছেন অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে গর্ভবতী নারীদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি জন্মগত ত্রুটি, অকাল গর্ভপাত এবং মৃত সন্তান জন্মদানের মতো মারাত্মক ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, তাপপ্রবাহ কীভাবে অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং তাঁদের গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ও ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে ঢাকার তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও খোলা জায়গায় থাকা মানুষের কাছে তা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো অনুভূত হচ্ছে। এই ধরনের তীব্র গরমের প্রভাব সরাসরি গর্ভকালীন স্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে।
গবেষকদের দাবি, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে মায়ের অসুস্থতা, শিশুর শারীরিক দুর্বলতা এবং অপরিণত অবস্থায় শিশুর জন্মের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে রয়টার্স মেক্সিকোর আট মিলিয়নেরও বেশি শিশুর জন্মসংক্রান্ত তথ্যের বিশ্লেষণ করেছে।
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে সংগৃহীত তথ্যের পর্যালোচনায় এক উদ্বেগজনক ফলাফল সামনে এসেছে। দেখা গেছে, মায়ের গর্ভকালের শেষ মাসে যদি তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, তবে অপরিণত অবস্থায় শিশুর জন্মের ঘটনা ১৮ শতাংশ বেড়ে যায়।
অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মের পর মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। আর যদি তারা বেঁচেও থাকে, তবে দীর্ঘ বছর ধরে নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় ভুগতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত তাপমাত্রার প্রভাবে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।
সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ সেখানকার জলবায়ুর সাথে অভ্যস্ত হয়ে থাকেন এবং শরীর সেই তাপমাত্রার ওঠানামার সাথে মানিয়ে নেয়। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, অভ্যস্ততার চেয়ে মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রায় অবস্থান করলেই একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। এই সামান্য ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পার্থক্যই একজন গর্ভবতী নারীর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিভিন্ন জলবায়ুর নারীদের ওপর এই একই ধরনের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। তা উত্তপ্ত মরুভূমি হোক, আর্দ্র বনভূমি কিংবা নাতিশীতোষ্ণ পাহাড়ি মালভূমি—সব জায়গার নারীদের ক্ষেত্রেই তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব একই রকম। অর্থাৎ ভৌগোলিক অবস্থান যাই হোক না কেন, স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রাই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মেক্সিকোর পাশাপাশি চীন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রেও বাড়তি তাপমাত্রার কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা নানাবিধ ঝুঁকিতে পড়ছেন।
তাপমাত্রার এই ভয়াবহ প্রভাব ঠিক কী কারণে ঘটছে, সে বিষয়ে গবেষকেরা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি। এই রহস্য উদঘাটনে আরও সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। তবে কারণ যাই হোক, মা ও অনাগত সন্তানদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।
বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এই ঝুঁকি কমানোর উপায় নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে চূড়ান্ত উত্তরের অপেক্ষায় বসে না থেকে অনেক দেশ এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে চওড়া হ্যাট ব্যবহার করা এবং বাড়ির ছাদে সাদা রং করার মতো পদক্ষেপ।
বিশ্বের এই উদ্যোগগুলো থেকে আমাদের দেশেও অনুপ্রেরণা নেওয়া যেতে পারে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের তাপপ্রবাহের প্রভাব থেকে বাঁচাতে পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক স্তরে বিশেষ যত্ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।