‘কোটা ছেড়ে কলম ধর, যোগ্যতা প্রমাণ কর’ স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণ। ছবিটা চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময়ের। ছবির নিচে লেখাটা শুরু হয়েছে, ‘এই মুহূর্তে আমি রাষ্ট্রের শীর্ষ অপরাধীদের মধ্যে একজন।’
এই আবেগঘন পোস্টটি অর্ঘ্য প্রতিম ঘোষ নামের একজন তরুণ চিকিৎসকের। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে তাঁর ইন্টার্নশিপ শেষ হয়েছে। ইন্টার্নশিপ শেষ করার আগেই তিনি ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে নিজের উপজেলা বা তার আশপাশে কোথাও পোস্টিং পাওয়ার আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভেরিফিকেশন রিপোর্ট নেতিবাচক আসায় চূড়ান্ত গেজেটে তাঁর নাম আসেনি। দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা দেওয়ার কথা ছিল যখন তাঁর, সেই মূল্যবান সময়টি এখন তাঁকে ব্যয় করতে হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দপ্তরে ছোটাছুটি করে।
তরুণ এই চিকিৎসকের ফেসবুক প্রোফাইলে প্রবেশ করলে দেখা যায়, ইন্টার্নশিপ চলাকালীন রোগী এবং সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর অনেক ছবি ও ভিডিও। কখনো তাঁকে রক্ত দিতে দেখা যায়, কখনো গান গাইতে, ছবি আঁকতে আবার কখনো বাঁশি বাজাতে। এমন একজন প্রাণবন্ত ও মেধাবী তরুণকে কেবল ভেরিফিকেশনের দোহাই দিয়ে বিসিএস থেকে বঞ্চিত করার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে, তা সাধারণ বোধগম্যতার বাইরে।
গেজেট থেকে বাদ পড়া মোট ছয়জন চিকিৎসকের মধ্যে তিনজনের ভেরিফিকেশনের সাথে এসবি-র একজন সহকারী পুলিশ পরিদর্শক জড়িত ছিলেন। এটি ভেবে অবাক হতে হয় যে, একজন শিক্ষার্থীকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার্থী নিজে, তাঁর অভিভাবক, শিক্ষক এবং রাষ্ট্রের যে বিপুল বিনিয়োগ, প্রচেষ্টা ও শ্রম ব্যয় হয়—তার সবকিছু এক মুহূর্তে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে কেবল পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার একজন সদস্যের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে।
কেবল অর্ঘ্য নন, ভেরিফিকেশনের অজুহাতে ইন্টার্ন শেষ করা আরও পাঁচজন তরুণ চিকিৎসকের নাম গেজেটে আসেনি। তাঁরা হলেন সর্পিতা সাহা, তন্ময় নন্দী, আবু মুছা, সাখাওয়াত হোসেন ও প্রসেনজিৎ নাগ। তাঁরা প্রত্যেকেই দেশের শীর্ষ দুটি মেডিকেল কলেজ—ঢাকা মেডিকেল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসক। তাঁদের কেউই জানেন না তাঁদের অপরাধ কী ছিল এবং কেন ভেরিফিকেশনের নামে তাঁদের নিয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে চিকিৎসকের সংকট দূর করতে ৪৮তম বিশেষ বিসিএস (স্বাস্থ্য) নেওয়া হয়েছিল। এতে মোট ৪১ হাজার ২৫ জন আবেদন করেছিলেন, যাদের মধ্যে ৫ হাজার ২০৬ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে ৩ হাজার ২৬৩ জনকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ১৯১ জন ইন্টার্নশিপ শেষ করে পিএসসিতে বিএমডিসি সার্টিফিকেট জমা দিয়েছিলেন। তবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ভেরিফিকেশন শেষে শেষ মুহূর্তে ছয়জনকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যূনতম মানদণ্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশে জনসংখ্যার অনুপাতে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রায় ৮৮ হাজার ৯০৯ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন। অথচ দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ মাত্র ৪১ হাজার ৮০৬টি। অর্থাৎ, বর্তমানে চিকিৎসকের শূন্য পদের সংখ্যা ১১ হাজার ৪৯৫টি। যখন এত বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য পড়ে আছে, তখন যোগ্য চিকিৎসকদের নিয়োগ আটকে রাখা কেবল রাষ্ট্রীয় অনাচারই নয়, বরং সাধারণ মানুষকে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।
একজন শিক্ষার্থীকে পাঁচ বছর মেডিকেল কলেজে পড়িয়ে এবং এক বছর ইন্টার্নশিপ করিয়ে চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তুলতে রাষ্ট্রের কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ও সমাজকাঠামোর বাস্তবতায় সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরাই সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পান। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে তাঁদের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসতে হয়। বর্তমান সময়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা এতটাই ব্যয়বহুল যে, শিক্ষার্থীদের পেছনে পরিবারের বিনিয়োগ সরকারি বিনিয়োগের চেয়ে বহুগুণ বেশি। এর বাইরেও মায়েদের যে নীরব ত্যাগ ও বিনিয়োগ থাকে, তার স্বীকৃতি খুব কমই মেলে।
বাদ পড়া চিকিৎসকদের একজনের মায়ের সংগ্রামের গল্প অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মা জানান, তাঁর সন্তান ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা করেছে। ভোররাতে ঘুম থেকে উঠে সন্তানের খাবার ও টিফিন তৈরি করা, সকাল ১০টার স্কুলে পাঠাতে সকাল ৮টায় বের হওয়া, দুইবার বাস পরিবর্তন করে কলেজে পৌঁছানো এবং একইভাবে সন্ধ্যা ৭টায় বাসায় ফেরা—এই ছিল তাঁদের দৈনন্দিন রুটিন। এরপর বিশ্রাম নিয়ে পরিবারের রাতের খাবার তৈরি করা। বছরের পর বছর ধরে সন্তানের জন্য মায়েদের এই যে আত্মত্যাগ, তার বিনিময়ে যখন জানা যায় ভেরিফিকেশনের নামে সন্তানকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তখন তার চেয়ে অন্যায্য ও দুঃখজনক আর কী হতে পারে!
গেজেট থেকে বাদ পড়া ছয়জনের মধ্যে তিনজনের ভেরিফিকেশনের সঙ্গে এসবির একজন সহকারী পুলিশ পরিদর্শক ছিলেন। ভাবছিলাম, একজন শিক্ষার্থীকে যোগ্য ও মেধাবী হিসেবে গড়ে তুলতে সেই শিক্ষার্থী, তাঁর অভিভাবক, শিক্ষক ও রাষ্ট্রের এত বিনিয়োগ, প্রচেষ্টা ও শ্রম—সবকিছু এক মুহূর্তে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার একজন সদস্য কী রিপোর্ট দিচ্ছেন বা দিচ্ছেন না, তার ওপর।
ঔপনিবেশিক আমলে রাজভক্ত সরকারি চাকরিজীবীদের বাছাই করার জন্য এই ভেরিফিকেশন প্রথা চালু করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও এই প্রথা বাতিলের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং প্রতিটি সরকারই একে জিইয়ে রেখে রাজনৈতিকভাবে অনুগত ব্যক্তিদের দিয়ে প্রশাসন সাজানোর চেষ্টা করেছে। প্রতিটি আমলেই ভেরিফিকেশনের জালে ফেলে অনেক যোগ্য ও মেধাবীদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ফ্রান্স থেকে স্পেন—পুরো ইউরোপজুড়ে আন্দোলনের জোয়ার বইছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান সম্প্রতি তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ‘ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নাগরিকদের সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়েছে।’ অথচ একটি আধুনিক, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন ও টিকিয়ে রাখার প্রধান শর্তই হলো এই সামাজিক চুক্তি। কাউকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা সেই সামাজিক চুক্তির চরম লঙ্ঘন। আর এই বৈষম্যের বিরুদ্ধেই শুরু হয়েছিল চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, যা পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
আমরা যদি সংবিধানকে রাষ্ট্র গঠনের সামাজিক চুক্তি হিসেবে গণ্য করি, তবে ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার অধিকার রাষ্ট্র বা সরকারের নেই। যে তরুণেরা ‘কোটা ছেড়ে কলম ধর, যোগ্যতা প্রমাণ কর’ বলে রাজপথে লড়াই করেছিলেন, সব যোগ্যতা প্রমাণের পরও যদি তাঁরা রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার শিকার হন, তবে প্রশ্ন জাগে—বৈষম্যটা আসলে কমল কোথায়?