মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরে চলমান শ্রমিক বিক্ষোভ চলাকালে হামলায় গুরুতর আহত হয়ে তৌফিক শেখ (২১) নামে এক পোশাকশ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

নিহত তৌফিক শেখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ছয়ঘড়িয়া গ্রামের তবিবুর রহমান তবি খানের পুত্র। তিনি গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় বসবাস করতেন এবং স্থানীয় লায়লা গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

তৌফিকের স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি বাংলাবাজার এলাকায় থেকে পোশাক কারখানায় কাজ করছিলেন। গত সোমবার নোমান গ্রুপের টেরিটোরি গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে হামলার ঘটনাটি মুঠোফোনে ধারণ করার চেষ্টা করেন তৌফিক। ঠিক সেই মুহূর্তে হামলাকারীরা তাঁর ওপর চড়াও হয়ে প্রচণ্ড মারধর করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে সহকর্মী শ্রমিকেরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।

তবে এই ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন। তিনি জানান, “একটি কারখানা বন্ধ করার জন্য বহিরাগত কিছু লোক সেখানে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করে। কারখানা কর্তৃপক্ষ বন্ধ করতে রাজি না হওয়ায় বহিরাগতদের সঙ্গে কারখানার শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। এতে এক শ্রমিক গুরুতর আহত হন। পরে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার সময় সেখানে পুলিশের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না।”

এদিকে শ্রমিক অসন্তোষ এবং শিল্পাঞ্চলের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে গাজীপুরের অর্ধশতাধিক তৈরি পোশাক কারখানায় গতকাল রাতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো কারখানায় এক দিনের, আবার কোনো কারখানায় দুই থেকে তিন দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। গতকাল রাতে কারখানা কর্তৃপক্ষের জারি করা পৃথক নোটিশ থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর এলাকার কটন ক্লাব (বিডি) লিমিটেড ও কটন ক্লাউড (বিডি) লিমিটেড যৌথভাবে দুই দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠান দুটির নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, “তৈরি পোশাকশিল্পে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ ও বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ, কর্মক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতা ও সার্বিক নিরাপত্তাঝুঁকির পরিপ্রেক্ষিতে আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার কারখানা দুটি বন্ধ থাকবে।” তবে নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের কর্মীরা এই ছুটির আওতামুক্ত থাকবেন বলে জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে, কালিয়াকৈর উপজেলার পূর্ব চন্দ্রা এলাকার লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। কারখানাটির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের নোটিশে বলা হয়েছে, “আজ সব শিফটের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বন্ধ থাকবে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) থেকে সব শিফট যথারীতি চালু হবে।”

এছাড়া গাজীপুর মহানগরীর ভোগড়া এলাকার প্যানোরোমা অ্যাপারেলস লিমিটেড, কাশিমপুরের মিতালী ক্লাব ও জকি গার্মেন্টস তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। কোনাবাড়ীর জরুন এলাকার স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ, মনটেক্স ও ডিবিএল—এই তিন প্রতিষ্ঠানই দুই দিনের ছুটি দিয়েছে।

লিজ ফ্যাশন কারখানার কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কারখানা দুই দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “এরপর শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় শ্রমিকেরা টানা তিন দিন ছুটি পাবেন। এর মধ্যে পরিস্থিতি শান্ত হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।”

কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার এপেক্স হোল্ডিং লিমিটেড এক দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। একই এলাকার ইকোটেক্স লিমিটেড, কোকোলা ফুড প্রোডাক্ট, সাদমা ফ্যাশন, হাইড্রোক্সাইড লিমিটেড, ইন্টারস্টফসহ অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে কোনোটি এক দিনের, আবার কোনোটি দুই দিনের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন জানান, এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি কারখানা বন্ধের খবর তাঁরা পেয়েছেন। তবে বিজিএমইএ কারখানা বন্ধ না রাখার ঘোষণা দিয়েছে বলেও তাঁরা জানতে পেরেছেন।