ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি এবং আরও কিছু যৌক্তিক দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় টানা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন পোশাকশ্রমিকরা। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। তবে এই বিক্ষোভের নেপথ্যে কারা শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে তাদের নজরদারিতে রেখেছে পুলিশ।

তদন্তে উঠে আসছে যে, আগামী ডিসেম্বরে বড় ধরনের কোনো আন্দোলনের প্রস্তুতি হিসেবে এই অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর যৌক্তিক দাবিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের কয়েকজন শ্রমিকনেতাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে কয়েকজন বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, কিছু শ্রমিকনেতা নির্দিষ্ট কয়েকজন শিল্পমালিকের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই আন্দোলনে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছেন।

নজরদারিতে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা

পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে রয়েছেন আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার মো. ওহাব খানের ছেলে মো. আজিজুল খান এবং ঘোষবাগ এলাকার মৃত আশেক আলী মোল্লার মেয়ে আসমা আক্তার। এছাড়া তালিকায় আছেন নিশ্চিন্তপুর এলাকার আইয়ুব আলীর মেয়ে লিপি আক্তার, একই এলাকার রাসেল এবং সিরাজ গ্রামের মো. আব্দুল কালামের ছেলে মো. আল আমিন। পাশাপাশি কুষ্টিয়ার ঈশানপুর এলাকার মো. আব্দুল রহিমের মেয়ে মোছা. সেলিনা খাতুনও রয়েছেন। কেয়া গ্রুপের শ্রমিক আসমা আক্তার আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে যে, তারা বিভিন্ন গার্মেন্টসে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের আড়ালে শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে আসছিলেন।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে ইন্ধন জোগাচ্ছেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। তাদের মূল লক্ষ্য হলো আগামী ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ‘সম্মানজনকভাবে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পরিস্থিতি’ তৈরি করা। এমনকি বিএনপি-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করার একটি কৌশল হিসেবেও এই উদ্যোগ চালানো হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্দোলনের সূত্রপাত ও বর্তমান পরিস্থিতি

পোশাকশ্রমিকদের এবারের আন্দোলনের সূচনা হয় আশুলিয়া থেকে। গত শনিবার সকাল ৮টার পর কাঠগড়া, আমতলা ও নয়াপাড়া এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হয়। প্রথমে নাঈম নিটওয়্যারের শ্রমিকেরা কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি পালন করেন এবং পরবর্তীতে তারা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

ধীরে ধীরে এই আন্দোলন সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরে ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার টানা চতুর্থ দিনের মতো এসব এলাকায় রাস্তায় নেমে আসেন শ্রমিকরা। তাদের বিক্ষোভ এবং মহাসড়ক অবরোধের ফলে একাধিক স্থানে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। মিরপুরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে, যাতে পুলিশ ও শ্রমিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। এই ঘটনায় শিল্প পুলিশ সাতজনকে আটক করেছে।

মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও শ্রমিকদের আন্দোলন থামেনি। বরং প্রতিদিন নতুন নতুন কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক বিক্ষোভের মুখে গত সোমবার পর্যন্ত ৭০০টি কারখানা বন্ধ ছিল এবং মঙ্গলবার আরও ৬২টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে ফিরবেন বলে তারা আশা করছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হলে সেটিকে ভিন্ন উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

নজরদারিতে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের নেতারা

গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী লিপি আক্তার গত ২০ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার নিউ এজ অ্যাপারেলসে যান এবং সেখানে বেশ কয়েকজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে লিপি আক্তার বলেন, “সরকার নতুন পে স্কেল ঘোষণা করেছে। যারা সরকারি বাথরুম পরিষ্কার করবে, পিয়ন তাদের বেতন দেবে ৩০ হাজার টাকা। আর আমরা ১৫ হাজারও পাই না। আমরা রেমিট্যান্স আনি দেশ চালাই। আমাদের টাকা দিয়া সরকারি বেতন বাড়াইছে। এবার সব জিনিসের দাম বাড়বে। আর আমরা না খেয়ে থাকব। আমরাও ৩০ হাজার টাকা বেতন চাই। না হলে যখন বলব কাজ বন্ধ করে দিবা। আমরা রাস্তায় না নামলে কোন সরকার আমাদের বেতন বাড়ায়নি।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য

আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, “সাধারণ শ্রমিকরা কাজে থাকতে চান। কিন্তু বহিরাগত কিছু লোকের ইন্ধনে একটি পক্ষ প্রতিদিন সকালে কাজে যোগ দিতে আসা শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে কারখানা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছে। তারা আমাদের নজরদারিতে আছে। তবে শ্রমিকদের মানসিকতা বুঝে সবকিছু সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।”

শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প পুলিশ তৎপর রয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “শ্রমিকেরা যাতে নিরাপদে কাজ করতে পারেন, সেজন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে নিরাপত্তার কারণে কিছু কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।”