পুঁজিবাজার বা শেয়ারবাজার মূলত বিনিয়োগকারীর নিজস্ব মূলধনের একটি ক্ষেত্র। সাধারণ অর্থে, দৈনন্দিন ও মাসিক ব্যয় নির্বাহের পর একজন ব্যক্তির কাছে যে বাড়তি অর্থ জমা থাকে, তাকেই বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত অর্থ বা পুঁজি বলা হয়। এই অর্থ ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করলে বাড়তি মুনাফার সম্ভাবনা থাকে, যা ব্যক্তির জীবনযাত্রার ওপর বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না।

সাধারণত মানুষ নিতান্ত বাধ্য না হলে ঋণ করে সংসার চালায় না কিংবা ঋণ নিয়ে ব্যাংকে সঞ্চয় করে না। এমতাবস্থায়, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ঋণ নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ, ঋণ গ্রহণ করলে তার বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করতে হয়। বিনিয়োগকারী যখন বাড়তি আয়ের আশায় শেয়ারবাজারে আসেন, তখন সেই মুনাফার একটি বড় অংশ যদি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়ে যায়, তবে সেই বিনিয়োগের প্রকৃত লাভজনকতা কোথায় থাকে? এই হিসাবটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করা প্রয়োজন।

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেমন অধিক মুনাফার সম্ভাবনা থাকে, তেমনি পুঁজি হারানোর প্রবল ঝুঁকিও বিদ্যমান। যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, ঋণ করে বিনিয়োগ করার পর লাভ তো দূরে থাক বরং মূল পুঁজিই ঝুঁকিতে পড়ল, তবে সেই ঋণের সুদ পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তাই ঋণ পরিহার করে সঞ্চয়ের একটি অংশ বিনিয়োগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে এমন শেয়ার নির্বাচন করা উচিত যেখানে দ্রুত মুনাফা না মিললেও পুঁজি হারানোর ভয় তুলনামূলক কম থাকে।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এমন অনেক কোম্পানি রয়েছে, যাদের গত ৫ থেকে ১০ বছরের শেয়ারের দাম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দাম একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা করে। এই ধরনের মানসম্মত কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে পুঁজির পুরোটা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তবে মনে রাখতে হবে, ভালো শেয়ার কম দামে কিনলেও ঋণ করে বিনিয়োগ করলে খুব বেশি লাভ হয় না, কারণ লাভের একটি বড় অংশ সুদে চলে যায়। এক্ষেত্রে প্রচলিত প্রবাদ ‘লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়’ কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হতে পারে।

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি ভিন্ন। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ঋণ প্রদান করে না। বিনিয়োগকারী চাইলে ব্যক্তিগত ঋণ বা পরিবার-পরিজনের কাছ থেকে ধার করে বিনিয়োগ করতে পারেন। এছাড়া ব্রোকারেজ হাউজ বা মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো শেয়ারের বিপরীতে ঋণ দিয়ে থাকে, যাদের মাধ্যমে বিও অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। উল্লেখ্য, এই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রচলিত সুদে টাকা নিয়ে তার সাথে বাড়তি সুদ যোগ করে বিনিয়োগকারীকে ঋণ দেয়। ফলে শেয়ারবাজারে ঋণের সুদের হার প্রচলিত হারের চেয়ে অনেক বেশি হয়, যা সাধারণত ১৫ থেকে ২০ শতাংশের কম হয় না।

এখন প্রশ্ন হলো, ১৫-২০ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করে মুনাফা করতে হলে কত শতাংশ রিটার্ন প্রয়োজন? কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পেতে হলে বিনিয়োগকারীকে অন্তত ২৫-৩০ শতাংশ বা তার বেশি মুনাফা করতে হবে, যা বাস্তবসম্মত নয়।

একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ঋণ করে এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেন এবং অন্য একজন তার নিজস্ব পুঁজি থেকে এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেন। তারা উভয়েই ১০০ টাকা দরে একই শেয়ার কিনলেন। পরবর্তীতে শেয়ারের দাম বেড়ে ১১০ টাকা হলে উভয়েরই মুনাফা হবে ১০ টাকা। কিন্তু ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তি এই মুনাফা দিয়ে ঋণের সুদই পরিশোধ করতে পারবেন না। অন্যদিকে, নিজস্ব পুঁজি বিনিয়োগকারী ব্যক্তি অনায়াসেই ১০ টাকা মুনাফা হিসেবে তুলে নিতে পারবেন।

এই তুলনামূলক হিসাব থেকে স্পষ্ট হয় যে, নিজস্ব পুঁজি বিনিয়োগকারীই বেশি লাভবান হন। তাই অত্যন্ত দক্ষ বা অভিজ্ঞ না হলে ঋণ করে বিনিয়োগে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, বড় পুঁজি সব সময় ছোট পুঁজিকে গ্রাস করে। তাই ঋণ করার চিন্তা করার আগে নিজের পুঁজির ভিত্তি মজবুত করা প্রয়োজন।