শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মূল্য আয় অনুপাত বা পিই রেশিও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। সাধারণত যে কোম্পানি বা খাতের পিই রেশিও যত কম থাকে, সেই খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি ততটাই কম বলে মনে করা হয়। এই মানদণ্ডে বর্তমানে শেয়ারবাজারে সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ খাত হিসেবে উঠে এসেছে ব্যাংক খাত। কারণ, ব্যাংক খাতের শেয়ারগুলোর গড় পিই রেশিও বর্তমানে সবচেয়ে নিচে। গত সপ্তাহ শেষে এই খাতের গড় পিই রেশিও দাঁড়িয়েছিল ৫ দশমিক ২৭-এ। তবে অবাক করার মতো বিষয় হলো, ঝুঁকি কম হওয়া সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক খাতের শেয়ারে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পিই রেশিও বিবেচনায় ব্যাংক খাতের শেয়ার কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতার কারণে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক বাদে অধিকাংশ ব্যাংকের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যের সত্যতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে সংশয় রয়েছে। পাশাপাশি, ভালো ব্যাংকগুলোও তাদের মূল ব্যবসায় টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। গত কয়েক বছরে কিছু ব্যাংকের মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও, তার বড় একটি অংশ এসেছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে। প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে আয়ের তেমন প্রবৃদ্ধি ঘটেনি। যেহেতু ট্রেজারি বিল-বন্ডের মুনাফা সাময়িক, তাই প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীরা এই খাতের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন।
ব্যাংকগুলোর দেওয়া মুনাফার হিসাবের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি এমন যে, পিই রেশিও কম হওয়া সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীরা এই খাতের শেয়ার কিনতে আগ্রহী নন।
বর্তমানে শেয়ারবাজারে মোট ৩৬টি ব্যাংক তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার কারণে পাঁচটি ব্যাংকের লেনদেন বন্ধ আছে এবং সেগুলোর শেয়ারের মূল্যমান শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া খেলাপি ঋণ ও নানা অনিয়মের কারণে বড় লোকসানের মুখে থাকা ৭টি ব্যাংকের হালনাগাদ পিই রেশিও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে নিয়মিত আয়ের ভিত্তিতে মোট ২৪টি ব্যাংকের পিই রেশিও হিসাব করা হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, এই ২৪টি ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে কম পিই রেশিও যমুনা ব্যাংকের, যা ২ দশমিক ৮৮। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক (৩ দশমিক ২৩) এবং তৃতীয় অবস্থানে সাউথইস্ট ব্যাংক (৩ দশমিক ৪৫)। চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে যথাক্রমে এনসিসি ব্যাংক (৩ দশমিক ৫১) এবং প্রাইম ব্যাংক (৪ দশমিক ১৪) রয়েছে। ডিএসইর হিসাব অনুযায়ী, এই ২৪টি ব্যাংকের মধ্যে ১১টির পিই রেশিও ৫-এর নিচে এবং ৭টির পিই রেশিও ১০-এর নিচে অবস্থান করছে।
পিই রেশিও কী এবং এর গুরুত্ব
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পিই রেশিও একটি প্রধান নির্দেশক। কোনো কোম্পানির শেয়ারের বর্তমান দাম এবং ওই কোম্পানির আয়ের অনুপাতের তুলনাকেই পিই রেশিও বলা হয়। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বছরে চারবার আয়ের হিসাব প্রকাশ করে, যার মধ্যে কেবল বার্ষিক হিসাবটি নিরীক্ষিত হয়; বাকি তিনটি প্রতিবেদন সাধারণত অনিরীক্ষিত থাকে। এই আর্থিক প্রতিবেদন ও আয়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে কোম্পানির পিই রেশিও পরিবর্তিত হয়। পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, যে কোম্পানির পিই রেশিও যত কম, সেখানে বিনিয়োগের ঝুঁকিও তত কম।
বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় শেয়ারের বিপরীতে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন, এবং ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও পিই রেশিও বিবেচনা করে। তবে পিই রেশিওর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে, কারণ যে ইপিএসের (EPS) ভিত্তিতে এটি হিসাব করা হয়, অনেক কোম্পানির ক্ষেত্রে সেই ইপিএস নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ।
বিষয়টি জানতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণভাবে শেয়ারবাজারে বলা হয় যে কোম্পানির পিই রেশিও যত কম, সেই কোম্পানিতে বিনিয়োগে ঝুঁকিও কম। তবে ব্যাংকগুলো যে মুনাফার হিসাব দেয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে যে পরিস্থিতি, তাতে কম পিই রেশিও হওয়ার পরও ব্যাংক খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম। এ ছাড়া আমাদের বাজারে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বদলে নিয়মিত ট্রেডিংয়ে বেশি আগ্রহী।
এ কারণে যেসব শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়ে, সেগুলোর প্রতি তাঁদের আগ্রহ বেশি থাকে। আবার ব্যাংকগুলো যে মুনাফা দেখাচ্ছে, তার বড় অংশই ট্রেজারি বিল বন্ড থেকে এসেছে, ব্যাংকের মূল ব্যবসা থেকে আয় সেভাবে বাড়েনি। তাই সব মিলিয়ে কম পিই রেশিও হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকের শেয়ার বিনিয়োগকারীদের খুব বেশি আগ্রহী করছে না।’
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক বছরে ব্যাংকগুলোর মুনাফা বাড়লেও লভ্যাংশের হার সেই অনুপাতে বাড়েনি। কারণ মুনাফার একটি বড় অংশ মন্দ ঋণের বিপরীতে প্রভিশনিং হিসেবে সরিয়ে রাখতে হচ্ছে। ফলে কাগজে-কলমে মুনাফা বাড়লেও বিনিয়োগকারীরা তার প্রকৃত সুফল পাচ্ছেন না, যা তাদের ব্যাংক খাতের শেয়ার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।