‘প্রথমেই মনে হয়েছে, আমার ছোট বাচ্চাটার কেন এমন হলো? এত দিন পর বাচ্চাটা হলো...এসব কথা বলতে গেলে বুক ফেটে যায়। সারাক্ষণ মেয়েকে নিয়ে চিন্তায় থাকি, কখন কী হয়ে যায়। হাসপাতালে গেলে মেয়ের ভেইন পাওয়া যায় না, ক্যানুলা নষ্ট হয়ে যায়, মেয়ে চিৎকার করে কাঁদে। তারপরও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি। এটা তো এখন আমাদের জীবনের অংশ, তাই সব মেনে নিয়েছি।’
কথাগুলো বলছিলেন মালিহা মোবাকশ্বেরা, যাঁর দুই চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরছিল। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলোচিত শিশু মিনহা রহমান রিদার মা। মাত্র ১৪ মাস বয়সী মিনহা ১১ মাস বয়স থেকেই রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে লড়াই করছে।
এই ছোট্ট মিনহার চিকিৎসার জন্য দেশ ও বিদেশের মানুষ যেভাবে এগিয়ে এসেছেন, তা সত্যিই অভাবনীয়। মিনহার মামা শাহাদাত জামান সৈকত চিকিৎসার সহায়তার লক্ষ্যে একটি ওয়েবসাইট (https://saveminha.xyz/) তৈরি করেন এবং ফেসবুকে একটি আবেদন জানান। সেই পোস্ট দেওয়ার মাত্র ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানেই ৬২ লাখ টাকার বেশি সহায়তা জমা হয়। সহায়তার পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকায় শাহাদাত জামান সৈকত পরবর্তী এক পোস্টে জানান যে, আপাতত আর টাকার প্রয়োজন নেই।
দাতাদের দেওয়া এই অর্থ দিয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে মিনহার চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। কথা বলার এক পর্যায়ে মালিহা মোবাকশ্বেরার মুখে সামান্য হাসি ফুটে ওঠে। তিনি জানান, অনেকে ১০০ টাকা, ৫০০ টাকা কিংবা তার চেয়েও কম অর্থ মিনহার জন্য পাঠিয়েছেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এই সহায়তার সমষ্টিতেই বড় অংকের অর্থ জমা হয়েছে।
মালিহা এই সহমর্মিতার জন্য সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চিকিৎসক যখন প্রথমবার মেয়ের ক্যানসারের কথা জানান, তখন পরিবারের সদস্যদের মনে কেবল খরচের চিন্তা ঘুরছিল। সোনার গয়না কতটুকু আছে বা জমি কতটুকু বিক্রি করতে হবে—তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। ফেসবুকে সহায়তা চাইলে মানুষ এভাবে পাশে দাঁড়াবে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। তবে শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়েছে।
মালিহা আরও জানান, মানুষের এই সহযোগিতা না থাকলে মেয়ের উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হতো না। এখন পর্যন্ত চিকিৎসার পেছনে ৪০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। আগামী চার বছর বা তার বেশি সময় এই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে, যার মোট খরচ কত হবে তা এখনো অনিশ্চিত। মালিহা আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, ‘মেয়ের হাসিটা সারা জীবন দেখতে চাই।’ মেয়ের মুখে সেই হাসি ধরে রাখতে প্রয়োজনে আবারও সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। তাঁর একমাত্র চাওয়া, মেয়েটি সুস্থ হয়ে বড় হয়ে উঠুক।
মিনহার বর্তমান পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসা প্রটোকল সঠিক পথেই এগোচ্ছে। চিকিৎসার মান যাচাই করতে মিনহাকে ভারতের একটি উন্নত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, সেখানকার চিকিৎসকরাও নিশ্চিত করেছেন যে বাংলাদেশে যে চিকিৎসা চলছে তা সঠিক।
মিনহার বাবা রোমান হোসেন নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত। মেয়ের অসুস্থতার পর মালিহা তাকে নিয়ে রাজধানীর বনশ্রীতে তাঁর মা ও ভাইয়ের সঙ্গে অবস্থান করছেন। এখন তাঁদের দিনের অধিকাংশ সময় হাসপাতালে কাটে। মালিহা বলেন, ‘মেয়ের ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকে আমাদের পুরো জীবনটাই পাল্টে গেছে।’
মালিহা ও শাহাদাত দুই ভাই-বোন, তাঁদের বাবা ইন্তেকাল করেছেন। গত মঙ্গলবার বনশ্রীর বাসায় কথা বলার সময় এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে ফোন আসে। জানানো হয়, বুধবার মিনহার বুকে ‘কেমো পোর্ট’ লাগানো হবে। এর আগে একবার লাগানো হলেও তা কাজ করেনি। এই পোর্ট লাগানোর পর পুনরায় কেমোথেরাপি শুরু হবে, যার খরচ প্রায় ৫০ হাজার টাকা এবং এর সাথে অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যুক্ত হবে।
মঙ্গলবার বাসায় দেখা যায়, মিনহা পরিবারের সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে। সে এখন দাঁড়াতে পারে এবং কিছু ধরে হাঁটার চেষ্টা করে। মুখে চারটি ছোট ছোট দাঁত বের করে সে হাসে। মা, বাবা ও মামা ডাকতেও শিখেছে সে।
মালিহা জানান, শারীরিক জটিলতার কারণে বিয়ের পর পাঁচ বছর তিনি মা হতে পারেননি। দেশ ও ভারতে দীর্ঘ চিকিৎসার পর তিনি মা হন। গর্ভাবস্থায় মালিহার থাইরয়েড, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানা সমস্যা ছিল। গত বছরের ২২ আগস্ট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মিনহার জন্ম হয় এবং ১১ মাস বয়স পর্যন্ত সে সুস্থ ছিল। এরপর হঠাৎ করেই ক্যানসারের লক্ষণ দেখা দেয়।
মিনহা খাওয়া কমিয়ে দেয় এবং তার ওজন বাড়ছিল না। গত মে মাসে একবার জ্বর আসে, যা পরে সেরে যায়। ক্যানসার শনাক্তের আগে মিনহার গলা ফুলে গিয়েছিল। ৩১ জুলাই হোয়াইট ব্লাড সেলের রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক প্রথম রক্তের ক্যানসারের সন্দেহ করেন এবং ১ আগস্ট থেকে তার চিকিৎসা শুরু হয়।
মিনহার মামা শাহাদাত জামান সৈকত মুক্তকণ্ঠকে জানান, মিনহার চিকিৎসায় কোনো সময় নষ্ট করা হয়নি। প্রথমে অন্য জায়গায় পরীক্ষা করা হলে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে পুনরায় পরীক্ষা করা হলে একই ফলাফল আসে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভর্তির পরামর্শ দিলেও প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অর্থ হাতে না থাকায় প্রথমে মিরপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করা হয়।
শাহাদাত আরও বলেন, ক্যানসারের কথা জানার পর তিনি এ বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং জানতে পারেন শিশুদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। সেই ঝুঁকি এড়াতেই শেষ পর্যন্ত এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন।
শাহাদাত সামাজিক উদ্যোগ ‘মজার স্কুল’-এর কো-ফাউন্ডার এবং দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাসেবক। বিভিন্ন মানুষকে আর্থিক সহায়তা পাইয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। একটি বড় স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি মিনহার জন্য সহায়তার উদ্যোগ নেন এবং ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে প্রচারণা চালান। ফেসবুকের প্রথম পোস্টটি আবেগ দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন হেরা অফেলিয়া লরেন, যাঁর সঙ্গে শাহাদাতের বিয়ের কথা চলছে। শাহাদাত তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এছাড়া কানাডাপ্রবাসী আত্মীয় এহসান খান আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম [GoFundMe (Canada)]-এর মাধ্যমে সহায়তার ব্যবস্থা করেন, যেখান থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা পাওয়া যায়। শাহাদাত বলেন, ‘যে হারে মানুষ টাকা পাঠাতে থাকেন, তা দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাই। এ টাকা ম্যানেজ করাই কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এ ছাড়া মিনহার চিকিৎসায় আসলে কত টাকা লাগবে, তা–ও আমাদের জানা নেই। আমরা কোনোভাবেই মানুষের কাছ থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বা অতিরিক্ত কোনো টাকা নিতে চাইনি। তাই সহায়তা চেয়ে পোস্ট দেওয়ার ১৩ ঘণ্টা পরেই আর সহায়তা লাগবে না বলে ফেসবুকে পোস্ট দিই।’
গত ৮ আগস্ট শাহাদাত ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘মিনহা পাখির জন্য একটা সমুদ্র চেয়েছিলাম আমি। ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই সেই সমুদ্রের জন্ম হয়ে গেছে। মাত্র ১৩ ঘণ্টায় আমরা ৬২ লাখ ৪১ হাজার ৮৩৮ টাকা (দেশ এবং বিদেশ) মিলিয়ে তুলে ফেলেছি।..আমরা সত্যিই বাক্রুদ্ধ। আপনাদের প্রত্যেকের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
ফেসবুকে অনেক আবেদন করা হলেও সবাই মিনহার মতো সহায়তা পান না—এই প্রশ্নের জবাবে শাহাদাত একে মিনহার ‘গুড লাক’ বলে অভিহিত করেন। তবে তিনি মনে করেন, মানুষ এখন অনলাইনে টাকা পাঠানোর আগে স্বচ্ছতা যাচাই করতে চায়। মিনহার ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে সব তথ্য দেওয়া ছিল এবং তা নিয়মিত আপডেট করা হয়, যা দাতাদের আস্থা বাড়িয়েছে।