ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মাত্র তিন দিনের মাথায় প্রাণ হারিয়েছে আট বছর বয়সী এক স্কুলপড়ুয়া মেয়ে। মৃত শিশুটি চিকিৎসক দম্পতি মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান ও ফারজানা সুলতানার বড় মেয়ে ফামইয়া মাশনুর। এই আকস্মিক মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন তাঁর বাবা-মা।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ–বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান পেশাগত জীবনে ডেঙ্গু আক্রান্তদের অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলতেন, পেটে ব্যথা, রক্ত বমি কিংবা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়ার মতো লক্ষণগুলো খেয়াল রাখতে হবে। কিন্তু তাঁর নিজের মেয়ে ফামইয়া মাশনুর রুমাইসার ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলোর কোনটিই দেখা দেয়নি। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ার আগেই মেয়েটি চিরতরে বিদায় নেয়।

মৃত ফামইয়া মাশনুরের বয়স ছিল ৮ বছর ১০ মাস ১৪ দিন। সে রাজধানীর আইডিয়াল স্কুলের বনশ্রী শাখার তৃতীয় শ্রেণিতে (ইংলিশ ভার্সন) পড়াশোনা করত। গত ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে তার জ্বর বাড়ে এবং তিন দিনের মাথায় ১ অক্টোবর বিকেলে সে মারা যায়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ফামইয়া মাশনুর ছিল এই দম্পতির বড় সন্তান। আগামী ১৭ নভেম্বর তার জন্মদিন ছিল। সেই উপলক্ষ্যে কক্সবাজারে ঘুরতে যাওয়া, কেক কাটা এবং মা-বাবা ও ছোট বোনের সঙ্গে সময় কাটানোর অনেক পরিকল্পনা করে রেখেছিল সে। এমনকি জন্মদিনে পরার জন্য নিজের এবং ছোট বোনের জামাও কিনে রেখেছিল সে।

মুহাম্মদ ওমর ফারুক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মেয়ের ডেঙ্গু পজিটিভ হওয়ার পর ওর অবস্থা খারাপ হচ্ছে—এমন কোনো সাইনই (লক্ষণ) তো ছিল না। বুঝতেই তো পারলাম না। স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়ার পর পিআইসিইউতে আধা ঘণ্টাও ছিল না, তার আগেই মারা গেল।’

এই দম্পতির ছোট মেয়ে ফারজিন মাহনুর ওয়ারিসার বয়স ৫ বছর ৮ মাস। সে সারাক্ষণ বড় বোনের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে থাকত এবং বড় বোন তাকে গোসল করিয়ে দিত। বোন কোথায় চলে গেছে, তা এখনো বুঝতে পারছে না ছোট্ট ফারজিন। সে তার বোনকে ‘ইয়া’ বলে ডাকত। তাকে বলা হয়েছে যে, ইয়া আল্লাহর কাছে চলে গেছে। সে তার মতো করে বিষয়টি বুঝে নিয়েছে।

মা ফারজানা সুলতানা এখন সারা ঘরে মেয়ের স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। ফামইয়া সবকিছু গুছিয়ে স্মৃতি ধরে রাখতে পছন্দ করত এবং কোনো জিনিস সহজে ফেলতে চাইত না। এখন পুরো বাড়ি স্মৃতিতে ঘেরা, আর মেয়েটি নিজেই হয়ে গেছে এক স্মৃতি।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে ওমর ফারুক ও ফারজানা সুলতানা জানান, ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার রাতে ফামইয়া মাশনুর জানায় যে তার জ্বর জ্বর লাগছে। পরদিন সোমবার সকালে জ্বর বাড়ে, যার ফলে সে স্কুলে যেতে পারে না। মঙ্গলবার পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ আসে এবং বাসায় ক্যানুলা করে স্যালাইন দেওয়া হয়। তবে ওমর ফারুক জরুরি কাজে ঢাকার বাইরে থাকায় বুধবার কোনো পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

ওমর ফারুক জানান, বৃহস্পতিবার মেয়েটি জানায় যে তার শরীর খারাপ লাগছে। খিঁচুনি শুরু হওয়ার পরপরই তাকে বনশ্রীর স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা পিআইসিইউ না থাকায় অন্য হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে স্কয়ার হাসপাতালে পিআইসিইউ পাওয়া যায়। তীব্র যানজটের কারণে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হয় এবং ততক্ষণে মেয়ের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয় এবং এরপরই সব শেষ হয়ে যায়। এর আগ পর্যন্ত কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ ছিল না; সে সবার সঙ্গে কথা বলেছিল এবং দাদির পাঠানো ডাবও খেয়েছিল।

সন্তানের এমন অকাল প্রয়াণে নিজেদের কপাল আর আয়ু এইটুকুই ছিল বলে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বাবা-মা। মারা যাওয়ার আগের দিন আমের জুস খেতে চেয়েছিল মেয়েটি, কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। আলমারিতে পড়ে থাকা জন্মদিনের জামাটি এখন তাঁদের আক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের এই সময়ে পুরো পরিবার মিলে হজ করতে গিয়েছিলেন। এছাড়া জুলাই মাসে সাজেকে বেড়াতে গিয়ে মা-বাবা ও বোনের সঙ্গে মেয়েটি শেষবারের মতো সেলফি তুলেছিল—এই স্মৃতিগুলো তাঁদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

ওমর ফারুক বলেন, ‘মেয়েটা খুব সংবেদনশীল ছিল। অসুস্থতার মধ্যে বমি করার পর বাসায় কাজের সহায়তাকারীর সামনে জামা পাল্টে দিলে সে মাকে বলেছিল, ওই আপুর সামনে জামা পাল্টানোতে তার লজ্জা লাগছে।’

তিনি আরও জানান, মেয়ের ডেঙ্গু হওয়ার আগে তার মায়ের ডেঙ্গু হয়েছিল। তখন বাসায় ক্যানুলা করে স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে মা সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু মেয়ের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থাই কাজে আসেনি।

হাসপাতালগুলোতে পিআইসিইউ-এর অভাব এবং সরকারি সেবার অপ্রতুলতার কথা উল্লেখ করে মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান মনে করেন, ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগে সরকার যদি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নিত, তবে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। তিনি অভিযোগ করেন, বনশ্রীতে তাঁর বাসার পাশেই ময়লার ভাগাড় রয়েছে যেখানে পানি জমে থাকে, কিন্তু তা দেখার কেউ নেই।

মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান বলেন, কষ্ট হবে বলে মেয়েকে পড়াশোনার বিষয়ে কখনো চাপ দেওয়া হতো না। বার্ন ইনস্টিটিউটে পুড়ে যাওয়া শিশুদের অবস্থা দেখে তিনি সবসময় ভয় পেতেন যেন মেয়ে রান্নাঘরে না যায় এবং কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। এই বাবার আক্ষেপ, যে মেয়েকে তিনি আগলে রাখতে চেয়েছিলেন, সে ছোট্ট এক মশার কামড়ে কষ্ট পেয়েই মারা গেল।