দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগের জন্য ৫৯২ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অনুমোদনের জন্য আজ বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবের বিবরণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নম্বর কূপ দুটি খননের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আজ বুধবারের একনেক সভায় এই নতুন গ্যাস প্রকল্পসহ মোট ১৪টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ‘তিতাস গ্যাসফিল্ডে ২টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন’ শীর্ষক এই প্রকল্পের প্রস্তাবনা পেশ করেছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। এই বাজেটের মধ্যে সরকারি ঋণ থেকে ৪৫৪ কোটি টাকা এবং বিজিএফসিএলের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ১৩৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আশা করছেন, গ্যাসের তীব্র চাহিদা মেটাতে প্রকল্পটি থেকে এক বছরের মধ্যেই গ্যাস পাওয়া সম্ভব হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএফসিএলের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আবুল কাসেম খান বলেন, ‘প্রথম বছরে একটি কূপ থেকে গ্যাস পাওয়া যেতে পারে; আর দেড় বছরের মধ্যে দুটি কূপ থেকেই গ্যাস পাওয়ার আশা করছি। এ ছাড়া আরও কিছু কূপ খননের প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে।’
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, এই দুটি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর পাশাপাশি দৈনিক প্রায় ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট বা তরল পেট্রোলিয়াম–জাতীয় পদার্থ পাওয়া যেতে পারে। উৎপাদিত এই গ্যাস সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে, যার ফলে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের মোট সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, দেশে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে সরকার জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। আর সেই লক্ষ্যেই গ্যাস অনুসন্ধানের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রকৌশলকাজ ও রিগ ফাউন্ডেশন নির্মাণসহ সমন্বিত খননকাজ সম্পন্ন করা হবে। খননকাজের জন্য বিদেশি ঠিকাদার নিয়োগের পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া কূপ থেকে উৎপাদিত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের জানিয়েছে, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই উদ্দেশ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেড এবং চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (সিএনপিসি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারা ৭টি গভীর কূপ এবং আরও ১৬টি কূপ খননের পরামর্শ দেয়। তাদের সেই কারিগরি পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নতুন কূপ খননের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আর্থিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুটি কূপ থেকে দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলে আগামী ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। একই সময়ে প্রায় ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদিত গ্যাস ও কনডেনসেটের বাজারমূল্য বিবেচনায় বাস্তবায়নকারী সংস্থা এখান থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুফল পাওয়ার প্রত্যাশা করছে।
প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত গ্যাসের মূল্য এবং ভোক্তা পর্যায়ের গ্যাসের মূল্য—এই দুই ধরনের হিসাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ের গ্যাসের মূল্য বিবেচনায় ১০ বছরে উৎপাদিত গ্যাসের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়বে, ফলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা প্রকল্পের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বলেন, এটি দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উৎপাদিত গ্যাস সার কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, চলমান জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় যত বেশি সম্ভব গ্যাসকূপ খনন করার ওপর জোর দিচ্ছেন জ্বালানিবিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা প্রয়োজন। এই বিষয়ে জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন দুটি গভীর কূপ খননের উদ্যোগ গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে কাজে লাগবে। তবে শুধু বাপেক্স–নির্ভর হলে হবে না। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকেও যুক্ত করতে হবে।’