পুলিশ বাহিনীর দীর্ঘদিনের যানবাহনসংকট দূর করতে এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই বিশাল বাজেটের আওতায় পিকআপ ভ্যান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য জিপ, সদস্যদের যাতায়াতের জন্য শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস ও মিনিবাস এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত বিভিন্ন যানবাহন কেনা হবে।

পুলিশ সদর দপ্তর এই লক্ষ্য অর্জনে দুটি পৃথক প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে সাধারণ অভিযান পরিচালনা সংক্রান্ত যানবাহনের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত যানবাহনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা।

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিপুলসংখ্যক যানবাহন পুড়ে নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া অনেক পুরোনো গাড়ি অভিযানের সময় বিকল হয়ে পড়ে। পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো ও সাজসরঞ্জাম তালিকায় (টিওঅ্যান্ডই) প্রয়োজনীয় যানবাহনের যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে নতুন গাড়ি কেনা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্প দুটির মধ্যে ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৮২৯টি যানবাহন কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৯০৯টি ডাবল কেবিন পিকআপ রয়েছে, যার প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ৮৬ লাখ টাকা। শুধু এই খাতে ব্যয় হবে ২ হাজার ৫০১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য ২ হাজার ৭০০ সিসির ৪০০টি জিপ কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার প্রতিটির দাম ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং মোট ব্যয় হবে ৬৭৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি ২ হাজার সিসির ৩৪৫টি জিপ কেনা হবে, যার প্রতিটির দাম ৭৫ লাখ টাকা এবং মোট ব্যয় হবে প্রায় ২৫৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুই ধরনের জিপ মিলিয়ে মোট ৭৪৫টি গাড়ি কেনা হবে।

এই প্রকল্পে ৫২ লাখ টাকা দরে ২১৪টি মাইক্রোবাস কেনার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ব্যয় হবে প্রায় ১১১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। পুলিশ সদস্যদের যাতায়াতের জন্য ৫২ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি নন–এসি বড় বাস এবং ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি এসি মিনিবাস কেনার কথা বলা হয়েছে।

অন্যান্য যানবাহনের মধ্যে ৯৫ লাখ টাকা দরে ১১৫টি প্রিজন ভ্যান, ৬৫ লাখ টাকা দরে ১০০টি প্যাট্রোল কার এবং ৫৫ লাখ টাকা দরে ৫০টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি স্পিডবোট কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া এই প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ৩০০টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পুলিশ বাহিনীর যেসব সদস্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাবেন, তাঁদের জন্যও কিছু বিশেষায়িত যানবাহন কেনা হচ্ছে। এ বাবদ যে অর্থ ব্যয় হবে, তা জাতিসংঘ পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করবে।”

অন্যদিকে, ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পে ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার একটি বিশেষায়িত যানবাহন কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো পুলিশের দক্ষতা বাড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা।

শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় ১৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি আর্মড পারসোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) এবং জনশৃঙ্খলা রক্ষায় ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ২০টি ওয়াটার ক্যানন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার ব্যয় হবে ১২৮ কোটি টাকা। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি ক্রাউড কন্ট্রোল ভেহিকেল এবং বিশেষায়িত ইউনিট ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের জন্য ১৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি সোয়াট ভ্যান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

দ্রুত অভিযানের জন্য ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি বিশেষায়িত প্যাট্রোল কার, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নিরাপদ পরিবহনের জন্য ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩টি বিশেষায়িত ভ্যান এবং থানা থেকে আদালত ও কারাগারে নেওয়ার জন্য ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৫টি প্রিজন ভ্যান কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

উচ্চগতির ২০০টি মোটরসাইকেল কিনতে ১৬০ কোটি টাকা এবং প্রশিক্ষিত কুকুর পরিবহনের জন্য ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০টি ইউটিলিটি টেরেইন ভেহিকেল কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্গম এলাকায় টহলের জন্য ৫০টি অল টেরেইন ভেহিকেল এবং পাহাড়ি এলাকার জন্য ১০০টি হিল মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। গোয়েন্দা কার্যক্রম ও তথ্য সংগ্রহের জন্য ১১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি মোবাইল সার্ভিল্যান্স গাড়ি কেনা হবে।

উপকূলীয় ও নদী এলাকায় দ্রুত চলাচলের জন্য ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি কুইক রেসপন্স বোট বা স্পিডবোট এবং উদ্ধারকাজের জন্য আরও ১৫টি রেসকিউ বোট কেনার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে কমান্ডারদের যাতায়াতের জন্য ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০৫টি কমান্ডারস সাব–আরবান ভেহিকেল, মৃতদেহ পরিবহনের জন্য ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি ফ্রিজার ভ্যান এবং নির্বাচন বা ধর্মীয় সমাবেশে ব্যবহারের জন্য ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি স্মল ডিপ্লয়মেন্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ঘোড়া পরিবহনের জন্য ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশেষ ১০টি যানবাহন এবং আরও প্রায় ৫৬টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব রয়েছে এই প্রকল্পের আওতায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুলিশের চার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপকের সমন্বয়ে গঠিত পাঁচ সদস্যের প্রাক্কলন কমিটি এসব যানবাহনের দাম নির্ধারণ করেছে। এছাড়া প্রকল্প দুটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে অতিরিক্ত আইজিপি মুশফেকুর রহমানের সভাপতিত্বে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশে পুলিশের ৪৫৫টি যানবাহন পুড়ে যায় এবং মোট ১ হাজার ৭৪টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে যানবাহনসংকট আরও প্রকট হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গাড়ির অভাবে নিয়মিত টহল ও অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং পুরোনো গাড়িগুলো মাঝপথে বিকল হয়ে যাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, “অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের প্রচুর গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাদের চাহিদা অনেক বেশি। এ কারণে বেশি করে পিকআপ কেনা হচ্ছে।” রক্ষণাবেক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পুলিশের নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে। তবে গাড়িগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে।”

তবে এত বিপুল অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মনে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে জিপ কেনার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কর্মকর্তারা মনে করেন, কেনাকাটার পাশাপাশি জ্বালানি, মেরামত, যন্ত্রাংশ, টায়ার ও বিমার মতো পরিচালন ব্যয় বহনের স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। বিশেষায়িত যানবাহনের ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা চলছে।

আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প দুটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে এই কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।