বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নারীদের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করে দলের সর্বস্তরে তাঁদের অন্তর্ভুক্তির দাবি করাকে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, নারীদের কেবল পৃথক কমিটিতে সীমাবদ্ধ রেখে প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার কথা বলা যায় না। টিআইবি উল্লেখ করেছে যে, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই এবং আমির, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের অন্তর্ভুক্তির কোনো চর্চাও নেই।

আজ মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে টিআইবি এই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সংস্থাটির করা গবেষণাকে ‘অসত্য’ ও ‘বিভ্রান্তিমূলক’ আখ্যা দিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, তার জবাবেই এই বক্তব্য এসেছে। টিআইবি জামায়াতের ওই দাবিকে ‘সত্যের অপলাপ’ বলেও অভিহিত করেছে।

সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রে প্রতিটি স্তরে পুরুষদের পাশাপাশি নারী কর্মীদের জন্য পৃথক কমিটি ও মজলিশে শুরা রাখার বিধান রয়েছে। তবে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। নারীদের পৃথক কমিটিতে সীমাবদ্ধ রেখে এটিকে প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি হিসেবে দাবি করা যায় না।”

উল্লেখ্য, গত রোববার ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টিআইবি। এই প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্বসহ প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই।

এই প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গবেষণার তথ্যকে ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’ বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামী গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের সব স্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা করে। একই সঙ্গে সংগঠনের সব স্তরে নারীদের কার্যক্রম ও কমিটি রয়েছে।”

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও জানান, দলটির অন্যতম দুটি প্রধান সাংগঠনিক ফোরাম হলো কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা। তাঁর দাবি অনুযায়ী, বর্তমান কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন নারী সদস্য এবং কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরায় ১২২ জন নারী সদস্য রয়েছেন। এছাড়া দলটির রুকনদের (সদস্য) মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশই নারী।

টিআইবির মতো একটি দায়িত্বশীল সংস্থার এমন ‘অসত্য তথ্যনির্ভর’ প্রতিবেদন প্রকাশকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ও দায়িত্বহীনতার পরিচয়’ বলে মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার। ভবিষ্যতে জামায়াত নিয়ে কোনো প্রতিবেদন বা প্রকাশনা তৈরির ক্ষেত্রে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জামায়াতের এসব যুক্তির জবাবে টিআইবি স্পষ্ট করেছে যে, তাদের গবেষণায় কোনো দলের জাতীয় বা কেন্দ্রীয় কাউন্সিল, সম্মেলন কিংবা মজলিশে শুরায় কতজন নারী সদস্য রয়েছেন, তা উল্লেখ করা হয়নি। বরং কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী কমিটি কিংবা পরিষদে নারীদের অন্তর্ভুক্তি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের দেওয়া তথ্যগুলো এই গবেষণার প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক নয়।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৩–২৫ সময়কালের ১৯ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। টিআইবি এটিকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সংশ্লিষ্ট বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর ৯০ খ (১) (খ) (আ) ধারা অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে সব পর্যায়ের কমিটিতে নারীদের জন্য ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ সদস্য পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এই বিধান পরিপালনে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।

টিআইবি বলেছে, জামায়াতে ইসলামী গবেষণা প্রতিবেদনটি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করায় দলটিকে তারা সাধুবাদ জানায়। তবে গবেষণার তথ্যকে অসত্য আখ্যা দিয়ে বিবৃতি দেওয়ায় সংস্থাটি বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়ে টিআইবির গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি কোনো আসনে নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। অথচ দলটির দাবি অনুযায়ী, তাদের রুকনদের প্রায় ৪৩ শতাংশই নারী। নারী সদস্যদের এমন উচ্চ অনুপাত থাকা সত্ত্বেও সংসদ নির্বাচনে কোনো নারীকে মনোনয়ন না দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের বিবৃতিতে কোনো মন্তব্য করা হয়নি বলে টিআইবি জানিয়েছে।

পাশাপাশি, সংস্থাটি জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের কয়েকটি ধারাকে বাংলাদেশের সংবিধানের জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্ম ও লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেছে।

গবেষণার তথ্যকে ‘অসত্য’ বা ‘বিভ্রান্তিমূলক’ বলার সুযোগ নেই উল্লেখ করে টিআইবি জামায়াতে ইসলামীসহ সব রাজনৈতিক দলকে গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে।

টিআইবি আরও উল্লেখ করেছে, জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারায় ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে সমাজ গঠন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে স্বীকার না করা এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য সব নিয়মনীতি ও পন্থা প্রত্যাখ্যানের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ইসলামি আকিদাপরিপন্থী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা, দলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে একমত হওয়া সাপেক্ষে অমুসলিম নাগরিকদের সদস্য বা সহযোগী সদস্য পদ দেওয়া এবং মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকদের সদস্য পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে পৃথক শর্ত আরোপের বিধান রয়েছে।

টিআইবির মতে, জামায়াতের গঠনতন্ত্রে নারী কর্মীদের জন্য পৃথক বিভাগ বা কমিটি গঠন এবং পৃথক কার্যক্রম পরিচালনার বিধানসহ এসব বিষয় বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্ম ও লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে এসব বিধানের বিরোধ রয়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি।

পরিশেষে টিআইবি বলেছে, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তাদের গবেষণার তথ্যকে ‘অসত্য’ বা ‘বিভ্রান্তিমূলক’ বলার সুযোগ নেই। বরং গবেষণার তথ্য অস্বীকার এবং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে জামায়াত দলের প্রকৃত রাজনৈতিক চর্চাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে বলে মনে করে সংস্থাটি। জামায়াতে ইসলামীসহ সব রাজনৈতিক দলকে গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফল গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে সুপারিশ অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।