সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো বজায় রাখা একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয় পরিচালনা এবং কর্মসূচি পালনের জন্য বছরে ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে। যদি এই সাংগঠনিক বিস্তৃতি ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তবে সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয় ১ হাজার ৫৩২ থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক দলগুলো যে আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করে, তার সঙ্গে দল পরিচালনার এই সম্ভাব্য ব্যয়ের এক বিশাল ব্যবধান রয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিচালিত এক গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নের এই প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে। আজ রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দলের সদস্যদের নিয়মিত চাঁদা থেকে যে পরিমাণ অর্থ সংগৃহীত হয়, তা সংগঠন পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে রাজনৈতিক দলগুলো আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক—উভয় ধরনের অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে থাকে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় কার্যক্রমের বড় একটি অংশের ব্যয়ভার বহন করেন স্থানীয় নেতা ও বিত্তবান ব্যক্তিরা। এই অর্থের কোনো হিসাবই দলের আনুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এই অর্থের ব্যবস্থাপনা অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় হয়, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিনির্ভর। ফলে সেখানে স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকে। দলগুলোর আনুষ্ঠানিক আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গেও বাস্তবতার বিশাল পার্থক্য রয়েছে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, “প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালোটাকা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে অন্তর্দ্বন্দ্ব বিকশিত হচ্ছে । এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা দলীয় অবস্থান একটি ‘ক্ষমতা-কেন্দ্রিক বিজনেস মডেলে’ পরিণত হচ্ছে ।”

টিআইবি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দলীয় কার্যালয় ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয় নির্ধারণ করেছে। গবেষণায় সাংগঠনিক বিস্তৃতির ওপর ভিত্তি করে তিন ধরনের হিসাব দেখানো হয়েছে।

প্রথমত, নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সাংগঠনিক কাঠামো—অর্থাৎ ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলা বা থানায় কার্যালয় থাকা একটি দলের বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কার্যালয় পরিচালনার ব্যয় সাড়ে ৫ কোটি থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে ব্যয় হতে পারে সাড়ে ৮ কোটি থেকে ১৮ কোটি টাকা।

দ্বিতীয়ত, দেশের ৬৪ জেলার ৪ হাজার ৫৫৩ ইউনিয়ন পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো থাকা একটি দলের বার্ষিক ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে কার্যালয় পরিচালনার ব্যয় প্রায় ৮৪ থেকে ১১৪ কোটি এবং কর্মসূচি পরিচালনায় প্রায় ২১৮ থেকে ২৭৯ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

তৃতীয়ত, সংগঠন যদি ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, তবে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৫৩২ থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। এই হিসাবে বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যালয় পরিচালনা, সভা-সমাবেশ, প্রচার-প্রচারণা, যাতায়াত এবং সাংগঠনিক সমন্বয়ের খরচ বিবেচনা করা হয়েছে।

গবেষণায় কার্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি ও আপ্যায়নসহ নিয়মিত খরচ এবং কর্মসূচির ক্ষেত্রে বছরে ন্যূনতম পাঁচটি কর্মসূচির ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে টিআইবি উল্লেখ করেছে যে, কার্যালয়ের মালিকানা, কর্মসূচির ধরন, স্থান ও সময়ভেদে এসব ব্যয়ের তারতম্য হতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর আয়ের ঘোষিত প্রধান উৎস হলো সদস্যদের চাঁদা, অনুদান এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত অর্থ। তবে শুধু সদস্যদের চাঁদার ওপর নির্ভর করে দল পরিচালনা করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে টিআইবি একটি হিসাব করেছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত দুটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে নির্ধারিত সদস্যসংখ্যা ও চাঁদার হারের ভিত্তিতে দেখা গেছে, ন্যূনতম নিবন্ধন শর্ত পূরণকারী একটি দলের সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য বার্ষিক আয় মাত্র প্রায় ২৬ লাখ টাকা। অথচ একই ধরনের সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনায় সম্ভাব্য ব্যয় ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা।

একইভাবে, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো থাকা দলের সদস্যদের চাঁদা থেকে বছরে প্রায় সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা আয় হতে পারে। আর ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সংগঠন থাকলে এই আয় হতে পারে ১১৬ কোটি টাকা।

গবেষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, শুধু সদস্যদের চাঁদার ওপর নির্ভর করে এই ধরনের বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তবে এই হিসাবগুলো সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের প্রাক্কলন মাত্র, কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রকৃত হিসাব নয়। কারণ চাঁদার পাশাপাশি অনুদান, মনোনয়ন ফি, বিশেষ তহবিল সংগ্রহ এবং অন্যান্য উৎসের অর্থ এই প্রাক্কলনে ধরা হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা অনেকাংশে ব্যক্তিনির্ভর। অধিকাংশ দল সভা, সম্মেলন, কর্মসূচি, আন্দোলন কিংবা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ সংগ্রহ করে। বিশেষত স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কার্যালয় পরিচালনা, সভা-সমাবেশ, কর্মীদের যাতায়াত ও অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রমের অর্থ স্থানীয় নেতারাই জোগান দেন, যা কেন্দ্রীয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না।

পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন দলগুলোর অর্থায়নে ব্যবসায়ী ও বিত্তবানদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হয়। আবার অনেকে দলীয় পদ, নির্বাচনী মনোনয়ন বা ভবিষ্যতে সুযোগ-সুবিধা লাভের প্রত্যাশায় বড় অঙ্কের অর্থ প্রদান করেন। টিআইবি বলছে, এই অর্থ নির্ভরতা রাজনৈতিক দলে পৃষ্ঠপোষকতামূলক সম্পর্ক তৈরি করছে, যার ফলে অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রার্থী মনোনয়ন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে।

অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক দল তৃণমূল পর্যায়ে গণচাঁদা বা ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে। এছাড়া মনোনয়নপত্র বিক্রি, প্রকাশনা বিক্রি এবং দলীয় সম্পত্তি থেকেও আয় করে থাকে তারা। গবেষণার পর্যবেক্ষণ হলো, বিপুল আর্থিক চাহিদা এবং স্বচ্ছ অর্থায়ন কাঠামোর সীমাবদ্ধতা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও অপরাধের রাজনীতিকরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত আয়-ব্যয়ের হিসাব ও সম্ভাব্য ব্যয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য তুলে ধরেছে টিআইবি। ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চারটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সর্বনিম্ন ঘোষিত আয় ১ কোটি ৮২ লাখ এবং সর্বোচ্চ ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে সর্বনিম্ন ব্যয় প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ এবং সর্বোচ্চ ২৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি ও নির্বাচনী কার্যক্রম বিবেচনায় এই ঘোষিত হিসাবগুলো প্রকৃত আয়-ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। তবে এই ঘোষিত হিসাব এবং ব্যয়ের প্রাক্কলন সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কোনো রাজনৈতিক দলেরই পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র আর্থিক নীতিমালা বা কার্যপ্রণালি নেই এবং তারা নিয়মিত বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে না। গঠনতন্ত্রে আয়ের উৎসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকলেও অর্থ সংগ্রহ, ব্যয়ের অনুমোদন, তহবিল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির বিস্তারিত বিধান নেই।

আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত দলগুলোকে প্রতিবছর নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। তবে টিআইবি বলছে, অনেক ক্ষেত্রে এই নিরীক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। প্রকৃত লেনদেন ও আয়ের উৎস প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় না। এমনকি নতুন বা ছোট দলগুলোর ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে নামমাত্র বা মনগড়া নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চর্চার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তথ্য প্রকাশের চিত্রও সন্তোষজনক নয়। পর্যালোচিত ১৬টি সক্রিয় রাজনৈতিক দলের কোনোটির ওয়েবসাইটেই বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন বা নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া প্রতিবেদনগুলোও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না, ফলে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ সীমিত থাকে।

রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সব দলের আর্থিক প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে টিআইবি। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের সব আয়-ব্যয় দলীয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা, নির্দিষ্ট সীমার বেশি লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করা এবং মানসম্মত হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা চালুর কথা বলেছে সংস্থাটি। নির্বাচন কমিশনকে নিরীক্ষিত প্রতিবেদন যাচাইয়ের ক্ষমতা দেওয়া এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং ফার্মের মাধ্যমে নিরীক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশও করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতার রাজনীতির চর্চার অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবর্তন হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে সুশাসনের ঘাটতি, অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার এবং জবাবদিহির অভাবের কারণে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি অব্যাহত রয়েছে।”

তিনি মন্তব্য করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দায়িত্ব দলগুলোকেই নিতে হবে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য দলীয় নেতৃত্বকে নিজেদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওছার আহমেদ ও কাজী আমিনুল হাসান। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।