প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালোটাকার প্রভাব এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফলে চরম অন্তর্দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, এসব নেতিবাচক প্রভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কিংবা দলীয় অবস্থান এখন একটি ‘ক্ষমতা-কেন্দ্রিক বিজনেস মডেলে’ পরিণত হয়েছে।
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের উপলক্ষ্যে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতার রাজনীতির চর্চার অবসান ঘটবে। সেখানে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ক্ষমতার রাজনীতির কারণে দলীয় কোন্দল, অন্তর্দ্বন্দ্ব, এমনকি মানুষের প্রাণ দিতে হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ের চেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সেটি আরও বেশি বিকশিত হচ্ছে। এটা উদ্বেগজনক।”
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে সুশাসনের যে অভাব রয়েছে, তা তুলে ধরে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক জানান, অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কার্যকর কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেই। জবাবদিহিতার এই ঘাটতির কারণেই বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়, যার ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা যেন এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে।
দলগুলোর অর্থায়নের অস্বচ্ছতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দল পরিচালনা করতে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই অর্থের ব্যবস্থাপনা হয় অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায়, যা মূলত ব্যক্তিনির্ভর। ফলে সেখানে স্বচ্ছতার চরম অভাব থাকে। দলগুলোর আনুষ্ঠানিক আয়-ব্যয়ের হিসাবের সাথে বাস্তব পরিস্থিতির বিশাল পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
ইফতেখারুজ্জামান আরও উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বা প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। যদিও কিছু আইন ও বিধিমালা বিদ্যমান, তবুও দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা এবং রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো শক্তিশালী আইনি কাঠামোর অভাব রয়েছে। এছাড়া দেশের আইনি কাঠামোর সাথে আন্তর্জাতিক মানের আইনি চর্চারও অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়।
রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানান টিআইবি নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অতি নিয়ন্ত্রণমূলক। অন্যদিকে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কার্যকর পদ্ধতি না থাকায় আইনি শর্তভিত্তিক ব্যবস্থার আড়ালে শুরু থেকেই অর্থনির্ভর প্রতিযোগিতামূলক পৃষ্ঠপোষকতা তৈরি হয়ে যায়।
দলীয় নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের আধিপত্যের বিষয়টিও সামনে আনেন ইফতেখারুজ্জামান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তৃণমূল, বিভিন্ন বৈচিত্র্যের মানুষ ও নারীদের অংশগ্রহণের ঘাটতির কারণে নেতৃত্ব বিকাশে পরিবারতন্ত্র বা অভিজাততন্ত্র প্রাধান্য পাচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য সাধারণ মানুষ সুযোগবঞ্চিত হচ্ছে। এটা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য কখনো ইতিবাচক হতে পারে না। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার।”
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি। টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যাবলিতে সুশাসন নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সংস্কার এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংস্কারের মূল দায়দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে বলে মনে করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের পূর্বশর্ত হিসেবে নেতাদের নিজেদের আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে এবং সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওছার আহমেদ এবং কাজী আমিনুল হাসান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবি উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।