জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এক আসামিকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাঁর পরিবারের কাছে ১ কোটি টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে। এই গুরুতর অভিযোগের মধ্যেই তিনি দেশ ছেড়েছেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র মুক্তকণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাইমুম রেজা তালুকদারের বিদেশভ্রমণের ওপর কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা ছিল না। ফলে তিনি কোথায় যাচ্ছেন বা যাবেন কি না, সে বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের করার কিছু নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঘটনার সূত্রপাত চট্টগ্রাম শহরে গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে জামিনে মুক্ত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁর পরিবারের কাছে ১ কোটি টাকা চেয়েছিলেন তৎকালীন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার। গত ১০ মার্চ মুক্তকণ্ঠ ও নেত্র নিউজ যৌথভাবে এই বিষয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় ঘটনাটি তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে, যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। উল্লেখ্য, যৌথ প্রতিবেদনটি প্রকাশের ঠিক আগের দিন, চলতি বছরের ৯ মার্চ সাইমুম রেজা তালুকদার পদত্যাগ করেন।
আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন আমিনুল ইসলাম। সে সময় এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, “একজন প্রসিকিউটরকে কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অপরাধে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তিনি ৩১ অক্টোবর দেশ ছেড়ে ইতালি চলে গেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি আট মাসেও প্রতিবেদন দিতে পারেনি, নাকি তাঁকে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি ইতালিতে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিল?”
এই প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “এর কোনোটিই নয়।” তিনি আরও জানান, ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে এবং এটি শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁরা এখন প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছেন।
আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, যাঁর (সাইমুম রেজা তালুকদার) বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ছিল, তাঁকে চাকরিচ্যুত (প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পদত্যাগ করেছেন) করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ট্রাইব্যুনালে যোগদানের এক মাসের মধ্যেই সাইমুম রেজার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেহেতু তাঁর বিদেশ যাত্রার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না, তাই তিনি কোথায় যাচ্ছেন সে বিষয়ে তাঁদের (চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়) কোনো কিছু করার নেই।
পরবর্তীতে ওই সাংবাদিক পুনরায় প্রশ্ন করেন, “আপনি (চিফ প্রসিকিউটর) সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সাইমুম রেজা যে ঘুষ চেয়েছিলেন, এটা প্রমাণিত হয়েছে। এর তো ফৌজদারি ভিত্তি আছে। সে ক্ষেত্রে আপনারা আট মাসেও দেননি। এ কারণে…।”
এর পরিপ্রেক্ষিতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “এই ঘুষ চাওয়া এবং দেওয়া—দুটোই কিন্তু অপরাধ। যাঁরা তাঁকে (সাইমুম রেজা) ঘুষ প্রস্তাব করেছিলেন, তাঁরাও কিন্তু সমভাবে দায়ী।” প্রতিবেদন দিতে বিলম্ব হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির একজন সদস্য দীর্ঘকাল অসুস্থ ছিলেন। এছাড়া তিনি নিজেও কিছু দিন বিদেশে ছিলেন এবং অন্য একজন প্রসিকিউটরের মায়ের মৃত্যুজনিত কারণে তিনি দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত ছিলেন। এসব নানাবিধ কারণে প্রতিবেদনটি দিতে দেরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন এবং আশ্বস্ত করেন যে, যথাশিগগির সম্ভব ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।