বাংলাদেশে নতুন করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করছে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হুন্দাই, হানওয়া এবং স্যামসাং। দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (সিইপিএ) আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পর বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই তথ্য জানান। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জারি করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, অর্থমন্ত্রীর দক্ষিণ কোরিয়া সফর চলাকালীন বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল হুন্দাই গ্লোভিস, হানওয়া ওশান এবং স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন।
জানা গেছে, গতকাল সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী জুং-সুং পার্কের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই বৈঠকে দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের বিষয়ে একমত হওয়া হয়। এই বিশেষ গ্রুপটি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তির হস্তান্তর এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করার কাজ করবে। সেই সঙ্গে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, ব্যবসা পরিচালনা সহজীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কার্যকর উপায়গুলো খুঁজে বের করবে এই গ্রুপটি।
বৈঠক চলাকালীন অর্থমন্ত্রী বলেন, “প্রচলিত বস্ত্র ও তৈরি পোশাকনির্ভর অংশীদারত্বের বাইরে গিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজ নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল শিল্পে সহযোগিতা বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া জ্বালানি, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পণ্য পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে দক্ষিণ কোরীয় বিনিয়োগের সুযোগগুলো তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করতে মূলধন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা, ইলেকট্রনিকস শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ২৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্যে নামানো এবং কাস্টমস ও বন্দরের কার্যক্রম সহজ করার উদ্যোগের কথা জানান অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) এবং পিপিপি মডেল ব্যবহারের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জুং-সুং পার্ক বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারত্ব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনা করা দক্ষিণ কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা এবং তাদের বিনিয়োগের আগ্রহের বিষয়গুলো নিয়ে একটি সমন্বিত তালিকা প্রদান করার কথা জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।
সফরকালে হুন্দাই গ্লোভিস, হানওয়া ওশান ও স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা।
হুন্দাই গ্লোভিসের প্রেসিডেন্ট লি কিউ-বকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বন্দর, লজিস্টিকস হাব, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মোটরগাড়িশিল্পের সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে সম্ভাবনা অনুসন্ধানে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং এ বিষয়ে দুই পক্ষের সমন্বয়ে একটি কর্ম পর্যায়ের দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হানওয়া ওশানের সঙ্গে আলোচনা হয় জাহাজ নির্মাণ, মেরামত, সামুদ্রিক অবকাঠামো এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) প্রকল্প নিয়ে। প্রতিষ্ঠানটি প্রথম পর্যায়ে বাংলাদেশে জাহাজ মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের কাজ শুরুর প্রস্তাব দিয়েছে। পরবর্তীতে জাহাজ নির্মাণসহ অন্যান্য সামুদ্রিক কার্যক্রমে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
অন্যদিকে, স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের প্রেসিডেন্ট কিম উ-জুনের সঙ্গে বৈঠকে ইলেকট্রনিকস উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান চালুর সম্ভাবনা অনুসন্ধানে স্যামসাংকে আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকেও বাংলাদেশে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।