বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কিছু শিল্প খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপানের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশন। এই প্রক্রিয়ায় জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
আজ রোববার সচিবালয়ে মারুবেনি করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসাইউকি ওমোতোর নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে বিশেষ করে সার উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, অটোমোবাইল এবং জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলা হয়।
বৈঠক চলাকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করা, প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা দেওয়া হবে।”
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী শিল্পের বিকাশে জাপানের প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি বলেন, “বিশেষ করে জাহাজ নির্মাণ ও পুনর্ব্যবহার, অটোমোবাইল, কৃষিভিত্তিক শিল্প আর উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর খাতে যৌথ বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ আছে। এসব খাতে বিনিয়োগ সহজ করতে সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে।”
আলোচনার এক পর্যায়ে বাংলাদেশ-জাপান সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) স্বাক্ষর ও বাস্তবায়নের বর্তমান অগ্রগতি, পাটশিল্পের বহুমুখীকরণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করা হয়।
সার ও তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগের আগ্রহ
মারুবেনি করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও সিইও মাসাইউকি ওমোতো বাংলাদেশে তাদের প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি চট্টগ্রামে অবস্থিত কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) আধুনিকায়ন, প্রাকৃতিক গ্যাসের কার্যকর ব্যবহার এবং সার উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ডিএপি ও টিএসপি সার উৎপাদনে নতুন বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে মারুবেনির সিইও জানান, যৌথ বিনিয়োগে পরিচালিত বিজেআইটির শত শত বাংলাদেশি প্রকৌশলী বর্তমানে জাপানসহ আন্তর্জাতিক বাজারে সেবা প্রদান করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা বিদেশে সরবরাহের (আইটি অফশোরিং) ক্ষেত্রে এই সহযোগিতার পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
পাট ও অটোমোবাইল শিল্পে নতুন সম্ভাবনা
পাটশিল্পের বহুমুখীকরণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “প্রচলিত পাটপণ্যের বাইরে গিয়ে উচ্চ মূল্যের বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। তুলা, ভিসকস ও পলিয়েস্টারের সঙ্গে পাটের আঁশ মিশিয়ে নতুন পণ্য তৈরি, উন্নত বীজ উদ্ভাবন ও গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।” এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও বিনিয়োগ কাজে লাগাতে আগ্রহী সরকার।
এছাড়া টয়োটা ব্র্যান্ডের গাড়ি উৎপাদন সংক্রান্ত প্রস্তাব, জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পে পরিবেশবান্ধব আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়েও আলোচনা হয়। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে ক্ষুদ্র মডিউলার পারমাণবিক চুল্লি (এসএমআর) প্রযুক্তির বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
বিনিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করার আশ্বাস
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, কোম্পানি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও মূলধন প্রত্যাবাসনের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
উক্ত বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উভয় পক্ষই বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা, সিইপিএর সম্ভাব্য সুফল কাজে লাগানো এবং শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে।