গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়াকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা জেসটেশনাল ডায়াবেটিস মেলিটাস হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই সমস্যার একটি বিশেষ দিক হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর কোনো স্পষ্ট উপসর্গ বা লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ফলে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা না করালে অনেক নারীই বুঝতে পারেন না যে তাঁদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে গেছে।

কিছু নির্দিষ্ট বিষয় এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, যার মধ্যে রয়েছে:

● অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা।

● পরিবারের নিকটাত্মীয়ের ডায়াবেটিসের ইতিহাস।

● মায়ের বয়স ২৫ বছর বা বেশি।

● শারীরিক পরিশ্রম ও নিয়মিত হাঁটাচলার অভাব।

● আগের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের ইতিহাস বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ওজনের শিশু জন্ম দেওয়ার ইতিহাস।

● পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম এবং প্রি ডায়াবেটিসের ইতিহাস।

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, উপরোক্ত ঝুঁকির কোনোটি না থাকলেও একজন নারীর গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হতে পারে।

সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত। তবে যদি কোনো নারীর ঝুঁকি বেশি থাকে, তবে চিকিৎসক প্রথম সাক্ষাতেই রক্তের শর্করা পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।

এই রোগের চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ নারীই সুস্থভাবে তাঁদের গর্ভাবস্থা অতিবাহিত করতে পারেন। চিকিৎসার প্রথম ধাপে সাধারণত সুষম খাবার গ্রহণ, খাদ্যগ্রহণে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিয়মিত হাঁটাচলা বা হালকা ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিয়মিত গ্লুকোমিটারের সাহায্যে রক্তের শর্করা মেপে সেই ফলাফল লিখে রাখা এবং মা ও শিশুর শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গর্ভাবস্থায় রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য ইনসুলিন একটি নিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি। তবে ইনসুলিনের কথা শুনে অনেক নারী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকের ধারণা, ইনসুলিন গ্রহণ করলে শিশুর ক্ষতি হতে পারে অথবা সন্তান জন্মের পর শিশুর ডায়াবেটিস হয়ে যাবে। চিকিৎসকদের মতে, এসব ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

মায়ের রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শিশুর অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, প্রসবকালীন জটিলতা এবং জন্মের পর শিশুর রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, প্রি–একলাম্পসিয়া, গর্ভে পানির তারতম্য কিংবা গর্ভস্থ শিশুর আকস্মিক মৃত্যুর মতো মারাত্মক ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

সন্তান প্রসবের পর অনেক নারীর রক্তের শর্করা পুনরায় স্বাভাবিক হয়ে আসে; তবে এই নারীদের ভবিষ্যতে টাইপ–২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তাই সন্তান জন্মের ৪–১২ সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় গ্লুকোজ পরীক্ষা করা জরুরি।

তথ্যসূত্র: সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগ, মার্কস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।