কক্সবাজারের রামু উপজেলার পেঁচার দ্বীপের দুর্গম পরিবেশে বেড়ে ওঠা রেজিয়া পারভীনের জীবন এক লড়াইয়ের গল্প। শৈশবে নিজ গ্রামে কোনো বিদ্যালয় না থাকায় প্রতিদিন সাত কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হতো তাঁকে সবচেয়ে কাছের স্কুলে। প্রতিকূল পরিবেশ আর দীর্ঘ পথচলা তাঁকে দমাতে পারেনি, বরং দৃঢ় সংকল্পে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। আজ তিনি নিজেই একজন শিক্ষক, যাকে এলাকার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ভালোবেসে ডাকেন ‘প্রিয় ম্যাডাম’ বলে।

রেজিয়া পারভীন কক্সবাজারের রামু উপজেলার পেঁচার দ্বীপের মাংলাপাড়ার বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি উপকূলীয় এই জনপদে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, যৌতুকের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি এবং মাদকবিরোধী প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। এছাড়া বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের পুনরায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর এই বহুমুখী প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক এবং অদম্য নারীর স্বীকৃতিসহ একাধিক সম্মানজনক পুরস্কার লাভ করেছেন।

নিজের জীবনসংগ্রাম ও লক্ষ্য সম্পর্কে রেজিয়া পারভীন বলেন, “প্রতিকূলতা সব সময় মানুষকে হারানোর জন্য আসে না; অনেক সময় নিজের ভেতরের শক্তিকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্যও আসে। আমার পথচলা যদি কোনো একজন নারীকে বা মেয়েকে নতুন করে বই হাতে নিতে সাহস জোগায়, কোনো মা যদি নিজের অসমাপ্ত স্বপ্নের কথা নতুন করে ভাবেন, তবেই আমার এই শিক্ষকতা সার্থক।”

ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী কক্সবাজার শহর থেকে ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত খুনিয়াপালং ইউনিয়ন। প্রায় ৪৭ দশমিক ৮২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ইউনিয়নে ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস করেন। ইউনিয়নের পশ্চিমাংশে পাহাড় ও সমুদ্রবেষ্টিত গ্রাম পেঁচার দ্বীপ, যা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। এখানে প্রায় ৮০০টি পরিবার রয়েছে, যাদের অধিকাংশের প্রধান পেশা কৃষি এবং কেউ কেউ সমুদ্র থেকে মাছ ধরে জীবনধারণ করেন।

খুনিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হক জানান, স্বাধীনতার পর থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডটি পাহাড়ের ভেতরে বিচ্ছিন্ন ছিল। যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে গ্রামের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য ৭ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে উখিয়ায় যেতে হতো, যার কারণে শিক্ষার হার ছিল অত্যন্ত কম। নব্বইয়ের দশকে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ নির্মিত হওয়ার পর এই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি হয়।

রেজিয়া পারভীন সাত কিলোমিটার দূরে উখিয়া সোনারপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যেতেন। বিয়ের পর পারিবারিক দায়িত্ব বাড়লেও শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ কমেনি। স্বামী মঞ্জুর হাসান এবং শাশুড়ির পূর্ণ সহযোগিতায় তিনি সাংসারিক কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৪ সালে তিনি শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করেন এবং বর্তমানে পেঁচার দ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বাড়ি মাংলাপাড়া থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার।

স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রেজিয়া কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানই করেন না, বরং সামাজিক পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। নিরাপদ সড়ক, বাল্যবিবাহ রোধ, যৌতুক বর্জন এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে তিনি নিয়মিত প্রচারণা চালান। পাশাপাশি উপকূলীয় দুর্যোগ, বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় করণীয় সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করেন তিনি। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সাথে উঠান বৈঠক করেন এবং তাঁদের বুঝিয়ে শিশুদের স্কুলে ফেরানোর চেষ্টা করেন।

পেঁচার দ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৩৪০ জন শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করছে। তিনতলা ভবনের এই বিদ্যালয়ে আটজন শিক্ষক কর্মরত আছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকতার আহমদ জানান, শিক্ষার মানোন্নয়নে তাঁরা সবাই সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করছেন। অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, রেজিয়া ম্যাডাম তাঁদের অত্যন্ত যত্ন ও ভালোবাসার সাথে পড়ান। ওই শিক্ষার্থীর বাবা কামাল উদ্দিন বলেন, অভিভাবক হিসেবে তাঁরা রেজিয়া ম্যাডামের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন এবং তাঁকে একজন অত্যন্ত কর্মঠ, মেধাবী ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হিসেবে গণ্য করেন।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, “রেজিয়া পারভীন প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা থাকলে সব বাধা পেরোনো যায়। এলাকায় বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের বিরুদ্ধে তিনি যেভাবে কাজ করছেন, তা প্রশংসনীয়।”

পরিবেশগত দিক থেকেও পেঁচার দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর কিছু অংশ প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) এবং পাশেই বয়ে গেছে রেজু খাল। সৈকতে লাল কাঁকড়া, সামুদ্রিক কাছিম ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিচরণ রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এলাকার কিছু অংশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের সচেতন করছেন রেজিয়া।

৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম সোহেল বলেন, রেজিয়া পারভীন শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি দুর্গম উপকূলের একজন সমাজকর্মী। তাঁর নিঃস্বার্থ উঠান বৈঠকগুলো ঝরে পড়া রোধে এবং সমাজ পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখছে। সোনারপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আজিজুল হক বলেন, রেজিয়া নিজের কঠোর পরিশ্রমে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এই দুর্গম উপকূলে পাওয়া সৌভাগ্যের বিষয়।

রেজিয়ার পারিবারিক পরিবেশও তাঁর সাফল্যের সহায়ক। তাঁর ভাই মোবারক হোছেন রামু সরকারি কলেজের শিক্ষক এবং অন্য ভাই দেলোয়ার হোসেন একজন ঠিকাদার। ছোট বোন খালেদা নাসরিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। রেজিয়ার বাবা আবুল হোছাইন (৭৪) বলেন, তিনি সৎ জীবন যাপন করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সন্তানদের মানুষ করেছেন এবং তাঁদের সাফল্যে তিনি অত্যন্ত গর্বিত।

রেজিয়ার দুই সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে মো. রেজাউল হাসান ফাহিম দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ছোট ছেলে মোহাম্মদ লাবিব হাসান পেঁচার দ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। রেজিয়ার স্বামী মঞ্জুর হাসান জানান, তিনি শুরু থেকেই স্ত্রীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। রেজিয়া স্কুল ও সামাজিক কাজের পাশাপাশি সংসারের প্রতিও সমান যত্নশীল।

সম্প্রতি টাঙ্গাইলে বদলি হওয়া জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া বলেন, রেজিয়ার ইচ্ছাশক্তি প্রবল। তিনি কেবল রুটিনমাফিক দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক নন, বরং একজন সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী মনের মানুষ। তাঁর এই অদম্য যাত্রা সমাজকে আলোর পথ দেখাচ্ছে।

শিক্ষকতার পাশাপাশি ২০১০ সাল থেকে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন রেজিয়া। দুর্যোগের দিনে উপকূলীয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি ২০২৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে সিপিপির পুরস্কার পান। ২০২৪ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক হিসেবে স্বীকৃতি পান তিনি। ২০২৫ সালে মহিলা অধিদপ্তর তাঁকে উপজেলা পর্যায়ে অদম্য নারী এবং জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

নিজের জীবনসংগ্রামের কথা স্মরণ করে রেজিয়া পারভীন বলেন, “প্রতিকূলতা সব সময় মানুষকে হারানোর জন্য আসে না; অনেক সময় নিজের ভেতরের শক্তিকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্যও আসে। আমার পথচলা যদি কোনো একজন নারীকে বা মেয়েকে নতুন করে বই হাতে নিতে সাহস জোগায়, কোনো মা যদি নিজের অসমাপ্ত স্বপ্নের কথা নতুন করে ভাবেন, তবেই আমার এই শিক্ষকতা সার্থক।”