কক্সবাজারের রামু উপজেলার পাহাড়ি জনপদের মাঝে অবস্থিত ঈদগড় বাজার। প্রতি শুক্রবার এখানকার সাপ্তাহিক হাটে শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, হাঁস-মুরগি, ডিম এবং ধান-চালসহ নানা পণ্যের কেনাবেচা হয়। ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি শুক্রবার এই বাজারের প্রায় ৪০০টি দোকানে চার কোটি টাকার পণ্য লেনদেন হয়ে থাকে। তবে সম্প্রতি ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কে সংঘটিত গণডাকাতির ঘটনার পর বাজারটিতে বেচাকেনা অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, শত বছরের পুরোনো এই বাজারটি কেবল রামুর জন্য নয়, বরং পার্শ্ববর্তী কয়েকটি উপজেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য একটি প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মহেশখালী, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার সদর এবং ঈদগাঁও উপজেলার পাইকাররা প্রতি শুক্রবার এই বাজারে এসে সবজি ও ধান-চাল ক্রয় করে নিয়ে যেতেন। কিন্তু বর্তমানে ডাকাত আতঙ্কে তাঁদের অধিকাংশেরই বাজারে আসা বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও সড়কে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে, তবুও স্থানীয় মানুষের মনে আতঙ্ক কাটেনি। এর ফলে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন হাজারো কৃষক।

সপ্তাহে শুক্র ও সোমবার ঈদগড় বাজারে হাট বসে। প্রতি শুক্রবার গড়ে চার কোটি টাকার পণ্য বেচাকেনা হলেও গণডাকাতির পর তা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত শুক্রবারের হাটে পণ্য বিক্রি হয়েছে মাত্র দুই কোটি টাকার মতো।

গত ১৯ অক্টোবর সকাল ও বিকেলে দুই দফায় ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এতে ৫০ থেকে ৬০টি যানবাহন ডাকাতদের কবলে পড়ে, যার বেশির ভাগই ছিল মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা। ডাকাতরা শতাধিক যাত্রীর কাছ থেকে মুঠোফোন, টাকা এবং মূল্যবান সামগ্রী লুট করে। ভুক্তভোগীদের দাবি, কয়েক ঘণ্টা ধরে এই লুটপাট চললেও ঘটনাস্থলে পুলিশের কোনো টহল ছিল না।

ঈদগড়, গর্জনিয়া ও বাইশারী এলাকায় অন্তত এক হাজার একর জমিতে ধান, শাকসবজি ও কলার বাগান রয়েছে। এছাড়া বাইশারীতে কয়েক হাজার একরজুড়ে ৪৫টির বেশি রাবার বাগান বিদ্যমান। পণ্য বিক্রি না হওয়ায় প্রতিদিন কোটি টাকার রাবার জমে থাকছে।

ঈদগড় বাজার কমিটির সভাপতি নুরুল হুদা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সপ্তাহে শুক্র ও সোমবার ঈদগড় বাজারে হাট বসে। প্রতি শুক্রবার গড়ে চার কোটি টাকার পণ্য বেচাকেনা হতো। গণডাকাতির পর তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত শুক্রবারের হাটে পণ্য বিক্রি হয়েছে দুই কোটি টাকার মতো।”

ক্রেতা স্বল্পতার কারণে লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। গত শুক্রবার দুপুরে ঈদগড় বাজারে দেখা যায়, স্থানীয় উৎপাদিত শাকসবজিতে বাজার ভরপুর থাকলেও ক্রেতার অভাব। এই বাজারে মুদি, কাপড়চোপড়, ওষুধ, স্টেশনারি, মোবাইল ও ইলেকট্রনিক পণ্যসহ চার শতাধিক দোকান রয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, আগে শুক্রবার সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমজমাট বেচাকেনা চলত, কিন্তু এখন বেলা তিনটার আগেই বাজার প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।

বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মহসিন ও ইজারাদার নুরুল কবির জানান, আগের তুলনায় বেচাকেনা অর্ধেকে নেমেছে। ফলে খেত ও বাগানে উৎপাদিত শাকসবজি, কলা, পেঁপে, ধান-চাল, মুরগি-ডিম, গরু-ছাগল ও দুধ বিক্রি করতে না পেরে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, আগে ছয়-সাতজন স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতি শুক্রবার ভোরে ঈদগড় থেকে কক্সবাজারের খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডী, নুনিয়াছটা ফিশারিঘাট ও চকরিয়া বাজারে গিয়ে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার সামুদ্রিক মাছ কিনে আনতেন এবং পরে বাজারে বিক্রি করতেন। এখন ক্রেতা না আসায় বিক্রি খুব কম হচ্ছে। মাছ ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন জানান, গত শুক্রবার বিক্রির জন্য বাজারে তিন মণ পাঙাশ, তেলাপিয়া ও রুই মাছ আনা হয়েছিল। বেলা দুইটা পর্যন্ত মাত্র এক মণ মাছ বিক্রি হয়। বাকি দুই মণ মাছ পচে যাওয়ার আশঙ্কায় লোকসানে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি। তিনি আরও জানান, দুই মাস আগে ভোরে ঈদগড় থেকে চৌফলদণ্ডীতে মাছ কিনতে যাওয়ার সময় হিমছড়ি ঢালায় ডাকাতের কবলে পড়েছিলেন তিনি। এর আগেও একবার ডাকাতেরা তাঁকে অপহরণ করেছিল।

গর্জনিয়া ইউনিয়নের বোয়াংখিল গ্রামের কৃষক মো. তারেক ৪০ শতক জমিতে আগাম মুলার চাষ করেছেন। শুক্রবার সকালে খেত থেকে দুই মণ মুলা তুলে ঈদগড় বাজারে আনলেও বিকেল চারটা পর্যন্ত মাত্র ২০ কেজি বিক্রি করতে পেরেছেন। কয়েক দিন আগে প্রতি কেজি মুলা ৫০ টাকায় বিক্রি হলেও ক্রেতা না থাকায় তাকে তা ২০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে।

ঈদগড় বাজারের মেসার্স নুরুল আলম অটো রাইস মিলে দেখা যায়, কারখানার ভেতরে ১২০ বস্তা চাল পড়ে আছে কিন্তু কোনো ক্রেতা নেই। মিলের মালিক আবুল কাশেম বলেন, ডাকাত আতঙ্কে বাইরের পাইকারেরা বাজারে আসতে পারছেন না, ফলে চালের বেচাকেনা প্রায় বন্ধ। আগে প্রতি শুক্রবার এই মিল থেকে অন্তত ১০০ বস্তা চাল কক্সবাজার, মহেশখালী ও ঈদগাঁওয়ের ব্যবসায়ীরা কিনে নিতেন, কিন্তু গত শুক্রবার বিক্রি হয়েছে মাত্র চার বস্তা।

ঈদগড় বাজারে আরও ১৪টি অটো রাইস মিল রয়েছে এবং সব মিলিয়ে এসব মিলে প্রায় দেড় হাজার বস্তা চাল মজুত আছে। বাইশারী, গর্জনিয়া, ঈদগড় ও ইসলামাবাদ ইউনিয়নের কৃষকেরা এসব মিলে চাল নিয়ে আসেন এবং পাইকারেরা তা জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন। তবে গত কয়েক দিন ধরে এই কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

কক্সবাজার শহর থেকে অন্তত ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে তৈরি। এই সড়কের প্রথম সাত কিলোমিটার ঈদগাঁও উপজেলায়, মাঝের পাঁচ কিলোমিটার রামুর ঈদগড় ইউনিয়নে এবং শেষ পাঁচ কিলোমিটার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নে পড়েছে।

গত ১৭ বছর ধরে এই সড়কে একাধিক ডাকাত দলের তৎপরতা চলছে, যেখানে নিয়মিত অপহরণ, ডাকাতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। গত ১২ বছরে এই সড়কে ডাকাতের গুলিতে পুলিশ, কণ্ঠশিল্পী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, এনজিওকর্মী ও কাঠ ব্যবসায়ীসহ অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও নিয়মিত ঘটে। বাসিন্দাদের দাবি, দিনদুপুরেও এই সড়কে ডাকাত আতঙ্কে থাকতে হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্যমতে, গত ১৭ বছরে এই সড়কে আটটি খুনের ঘটনা এবং ৫০টির বেশি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ২৩ জন মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন। দিনের বেলায় পুলিশি পাহারায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, টমটম, মিনিট্রাক ও মোটরসাইকেল চলাচল করলেও সন্ধ্যার পর আতঙ্কভয়ে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকে। এতে ঈদগাঁও, ঈদগড়, গর্জনিয়া ও বাইশারী ইউনিয়নের দেড় লাখের বেশি মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সড়কের মাঝামাঝি এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে একটি যৌথ তল্লাশিচৌকি স্থাপন করা হোক। ঈদগড় ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, “গণডাকাতির ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকে ভয়ে সড়কে যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছেন। ডাকাতি, অপহরণ ও লুটপাট বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে স্থায়ী যৌথ তল্লাশিচৌকি স্থাপন এখন সময়ের দাবি।”

ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিফাতুল মাজদার জানান, ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কের গভীর বনাঞ্চলে পুলিশের সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা হয়েছে। ডাকাতির ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে এবং রায়হান ডাকাতসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রায়হানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। অভিযানে লুণ্ঠিত ৭ হাজার ২৩০ টাকা, একটি মুঠোফোনসহ বিভিন্ন অলংকার উদ্ধার করা হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মাহমুদুল হাসান বলেন, সড়কের গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া ও ঈদগড় এলাকায় কয়েকটি ডাকাত দলের আস্তানা রয়েছে। চিহ্নিত কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। সড়কে পুলিশের একটি স্থায়ী ফাঁড়ি স্থাপনের অনুমোদন পাওয়া গেছে। গত পাঁচ দিনে সড়কে কোনো ডাকাতি বা লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি।