আতশবাজিবিরোধী প্রচারণায় বলিউড অভিনেত্রী দিয়া মির্জার ভিডিও বার্তা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ভারতের বম্বে হাইকোর্ট। মঙ্গলবার বিচারপতি গিরিশ এস কুলকার্নি এবং বিচারপতি নীলা গোখলের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে ওই ভিডিও বার্তা পুনরায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই এই আতশবাজিবিরোধী সচেতনতামূলক প্রচারাভিযানটি শুরু করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও দিয়া মির্জার ভিডিও বার্তাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা আদালত মেনে নিতে পারেনি। ক্ষুব্ধ বিচারপতিরা মনে করিয়ে দেন যে, ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং মুম্বাই শহরের মূল ভিত্তি হলো একতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। তাঁদের মতে, কয়েকজন দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তির মন্তব্যের কারণে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।

দীপাবলির সময়ে আতশবাজি পোড়ানোর ফলে পরিবেশ দূষণ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বম্বে হাইকোর্ট বৃহন্মুম্বাই পৌরসভাকে নির্দেশ দিয়েছিল যেন সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে প্রচার চালানো হয়।

বিজেপি ও শিবসেনা পরিচালিত ওই পৌরসভা এই প্রচারের জন্য মাধুরী দীক্ষিত, দিয়া মির্জা, মারাঠি সিনেমার অভিনেত্রী নিশিগন্ধা ওয়াড এবং ক্রিকেটার অজিঙ্ক রাহানের মতো জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের বেছে নিয়েছিল। তবে মুম্বাইয়ের মেয়র বিজেপিনেত্রী রীতু তাওড়ে এবং বিজেপির মুম্বাই শাখার সভাপতি অমিত সাটমের মতো নেতাদের আপত্তির মুখে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দিয়ার ভিডিও বার্তাটি সরিয়ে দেয়।

পৌরসভার এই পদক্ষেপ বম্বে হাইকোর্টকে বিচলিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। যার ফলে আজ মঙ্গলবার ওই ভিডিও বার্তাটি পুনরায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ জারি করা হয়। পৌরসভার এই সিদ্ধান্তকে দুর্ভাগ্যজনক আখ্যা দিয়ে বিচারপতিরা বলেন, বিষয়টিকে ‘ভিন্ন রং’ লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ডিভিশন বেঞ্চের মতে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং সংবিধানের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ওই ভিডিও বার্তাটি পুনরায় প্রকাশ করাই হবে আদর্শ পদক্ষেপ।

হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী দিয়া মির্জার পদবিই তাঁর ভিডিও বার্তা সরিয়ে নেওয়ার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও জন্ম সূত্রে তিনি মুসলিম নন। তাঁর বাবা ছিলেন খ্রিষ্টান এবং মা বাঙালি হিন্দু। জন্মের পর মা-বাবার বিচ্ছেদ হলে তাঁর মা দীপা হায়দরাবাদের মুসলিম যুবক আহমেদ মির্জাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। সেই সৎ বাবার পদবিই দিয়া ব্যবহার করে আসছেন।

দিয়া নিজেও দুইবার বিয়ে করেছেন এবং তাঁর জীবনসঙ্গী উভয়েই হিন্দু। তা সত্ত্বেও তাঁর পদবি ‘মির্জা’ হওয়ায় উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা দীপাবলির দূষণ রোধে তাঁর আবেদনকে ‘অনধিকার চর্চা’ হিসেবে গণ্য করেছেন। তাঁরা পৌরসভার ওপর চাপ সৃষ্টি করে দাবি করেন যে, হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় কী করা উচিত বা অনুচিত, সে বিষয়ে কোনো বিধর্মীর কাছ থেকে জ্ঞান নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

মুম্বাইয়ের মেয়র রীতু তাওড়ে অভিযোগ করেছেন, দিয়া বরাবরই হিন্দুত্ববিরোধী কথাবার্তা বলেন, তাই পৌরসভার হ্যান্ডেলে তাঁর বার্তা দেওয়া যাবে না। হিন্দুত্ববাদীদের এই প্রবল প্রতিরোধের কারণেই গত সোমবার বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা দিয়ার বার্তাটি সরিয়ে ফেলে।

এই ঘটনায় বম্বে হাইকোর্ট তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, শব্দ ও বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির নির্দেশ খোদ আদালতই দিয়েছিল। এই মহৎ কাজে বিভিন্ন পেশার তারকারা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই সাহায্য করেছেন এবং পৌরসভা কার্যকর পদক্ষেপও নিয়েছিল। কিন্তু এখন কয়েকজনের ব্যক্তিগত মতামতের কারণে পুরো বিষয়টি বাধাগ্রস্ত হওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এমন জনহিতকর উদ্যোগে কয়েকজনের হঠকারী মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়ার কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।

বিচারপতি গিরিশ কুলকার্নি ও বিচারপতি নীলা গোখলে বলেন, “যা ঘটেছে তাতে আমরা গভীরভাবে ব্যথিত। এমন জনহিতকর কাজের মধ্যে অন্য কোনো বিষয় টেনে আনার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। যেকোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের মানুষই এই প্রচারে অংশ নিতে পারেন। বার্তা দিতে পারেন।”

বিচারপতিরা আরও উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা এখন বিশেষ প্রয়োজন। যেহেতু এই উদ্যোগটি আদালতের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে, তাই সবার উচিত একে সমর্থন করা এবং শামিল হওয়া। জনহিতকর বিষয়কে অন্য কোনো দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা উচিত নয়। তাঁরা মনে করিয়ে দেন, ধর্ম নির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষ একই বাতাসে শ্বাস নেন এবং আমরা একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশের নাগরিক।

আদালতের মতে, যাঁকে নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে, তিনি পরিবেশ রক্ষা ও শব্দদূষণ রোধে অত্যন্ত কার্যকর বার্তা দিয়েছেন। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে একে অপরের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া সঠিক কাজ নয় এবং উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়।

পৌর কর্তৃপক্ষকে ভিডিওটি ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়ে আদালত বলেন, “দু–একজনের বিচ্ছিন্ন মন্তব্যে আমল না দিয়ে ভিডিও বার্তাটি ফিরিয়ে এনে সমাজ ও সংবিধানের ওপর মানুষের আস্থা ফেরান।”