প্রশাসনিক ভিত্তি যদি কঠোর নীতি, নৈতিকতা ও জবাবদিহির ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে তা অচিরেই অনিয়ম ও স্বৈরাচারে রূপ নেয়। খলিফা ওমর (রা.) এটি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রীয় পদ বা শাসনক্ষমতা কোনো ব্যক্তির জন্য ব্যক্তিগত সম্মান বা ভোগের বিষয় নয়, বরং এটি জনগণের আমানত এবং আল্লাহর দরবারে চূড়ান্ত জবাবদিহিতার এক গুরুদায়িত্ব।

পূর্বের ইরাক থেকে শুরু করে পশ্চিমে মিসর পর্যন্ত বিস্তৃত এই সুবিশাল সাম্রাজ্য মদিনায় বসে একা খলিফার পক্ষে এককভাবে পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। ফলে প্রাদেশিক গভর্নর (ওয়ালি) নিয়োগ এবং তাদের ওপর সুদৃঢ় প্রশাসনিক নজরদারি বজায় রাখা হয়ে উঠেছিল তার শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

তিনি প্রশাসনিক সংস্কার, আমলাদের ওপর তদারকি এবং জনগণের অভিযোগ সরাসরি শোনার এমন একটি উন্নত কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যও অনুকরণীয় মডেল।

তাঁর প্রধান কৌশল ছিল প্রশাসনিক কর্মকর্তা নির্বাচনে কঠোর বস্তুনিষ্ঠতা। তিনি ধর্মীয় জ্যেষ্ঠতাকে প্রশাসনিক যোগ্যতার বিকল্প মনে করতেন না। কোনো মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে সৎ হতে পারেন, কিন্তু প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় তিনি দক্ষ নাও হতে পারেন। একইভাবে ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী হওয়া মানেই রাষ্ট্র পরিচালনায় পারদর্শী হওয়া নয়।

তিনি নিয়োগের ক্ষেত্রে আমানতদারিতা বা সততার পাশাপাশি ব্যক্তির মেধা, বুদ্ধিমত্তা ও কাজের দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতেন। তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, “আপনি কেন নবীজির জ্যেষ্ঠ সাহাবিদের প্রশাসনিক কাজে নিয়োগ দিচ্ছেন না?”

আমি অনেক সময় একজন তুলনামূলক কম উত্তম মানুষকে গভর্নর বানাই, কারণ তার প্রশাসনিক কাজের দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেশি থাকে।

তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “তারা মর্যাদায় অনেক উর্ধ্বে, আমি প্রশাসনিক ঝুটঝামেলায় জড়িয়ে তাদের সেই আত্মিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে চাই না।” তিনি বলতেন, “আমি অনেক সময় একজন তুলনামূলক কম উত্তম মানুষকে গভর্নর বানাই, কারণ তার প্রশাসনিক কাজের দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেশি থাকে।” (আলী মুহাম্মদ আস-সাল্লাবি, উমারর ইবনুল খাত্তাব: সাহাবিয়্যুন জালিল ওয়া খালিফাতুন আদিল, পৃ. ২০০, মুয়াসসাসাতু ইকরা, কায়রো, ২০০৭)

তার নিয়োগ দেওয়া গভর্নরদের তালিকার দেখা যায়, তিনি সিরিয়াতে মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান, মিসরে আমর ইবনুল আস, বসরায় আবু মুসা আশআরি এবং কুফায় আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)-কে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

সাহাবি মুয়াবিয়া বা আমর ইবনুল আসের ইসলাম গ্রহণ তুলনামূলকভাবে পরে হলেও তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা ছিল অসাধারণ।

খলিফা ওমর (রা.) অঞ্চলের ভৌগোলিক গুরুত্ব ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই উপযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত স্থানে বসাতেন।

তিনি প্রার্থনায় বলতেন, “হে আল্লাহ, অসৎ মানুষের কর্মদক্ষতা এবং সৎ মানুষের কাজের অক্ষমতা নিয়ে আমি তোমার কাছে আর্জি পেশ করছি।” (ইবনে তাইমিয়া, আস-সিয়াফাতুশ শারইয়্যাহ ফী ইসলাহির রাই ওয়ার রাইয়্যাহ, রিয়াদ: ওয়াজারাতুশ শুউনিল ইসলামিয়্যাহ, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ২০)

তাঁর প্রশাসনিক দর্শনে গভর্নর নিয়োগের অর্থ এই ছিল না যে তাদের হাতে অবাধ ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রাদেশিক প্রতিনিধিরা রাজধানী মদিনা থেকে বহুদূরে অবস্থান করতেন বলে ক্ষমতার অপব্যবহারের বা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা সব সময় থাকত।

এই কারণে তিনি নিয়োগের প্রথম দিন থেকেই কঠোর শর্ত আরোপ করতেন। একটি লিখিত নিয়োগপত্র বা চুক্তিপত্র তৈরি করতেন এবং মুহাজির সাহাবিদের একটি দলকে তার ওপর সাক্ষী রাখতেন। সেই চুক্তিপত্রে কয়েকটি স্পষ্ট শর্ত উল্লেখ থাকত:

জেনে রাখো, আমি আমার কর্মকর্তাদের তোমাদের প্রহার করার জন্য কিংবা তোমাদের ধনসম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য পাঠাই না। বরং আমি তাদের পাঠাই যেন তারা তোমাদের ধর্ম ও সুন্নত শিক্ষা দেয়।

কখনো দামি বা রাজকীয় আভিজাত্যের ঘোড়ায় চড়তে পারবেন না

মিহি চালের রুটি বা বিলাসবহুল খাবার খেতে পারবেন না

পাতলা বা বিলাসী রাজকীয় পোশাক পরতে পারবেন না

সাধারণ জনগণের সুবিধার জন্য নিজের দরজার কপাট কখনো বন্ধ রাখতে পারবেন না।

এই শর্তগুলোর যেকোনো একটি লঙ্ঘন করলেই তার ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/১১৪, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০৬)

শর্তগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল যেন রাষ্ট্রীয় পদ কোনোভাবেই বিলাসিতার প্রদর্শনের মাধ্যমে পরিণত না হয়। খলিফা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যেন শাসক ও শাসিতের মধ্যে কৃত্রিম প্রাচীর তৈরি না হয়।

এরপর আসত কঠোর জবাবদিহি।

এক ভাষণে তিনি জনসমক্ষে ঘোষণা করেছিলেন, “জেনে রাখো, আমি আমার কর্মকর্তাদের তোমাদের প্রহার করার জন্য কিংবা তোমাদের ধনসম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য পাঠাই না। বরং আমি তাদের পাঠাই যেন তারা তোমাদের ধর্ম ও সুন্নত শিক্ষা দেয়। অতএব, যদি কারো সঙ্গে এর ব্যতিক্রম কিছু করা হয়, তবে সে যেন তা সরাসরি আমার কাছে উত্থাপন করে। আল্লাহর কসম, আমি নিশ্চিতভাবেই তার কাছ থেকে এর প্রতিশোধ বা বিচার আদায় করব।” (আহমাদ ইবনে হাম্বল, আল–মুসনাদ, ১/৪২, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০১)

প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে খলিফা ওমর (রা.) যে পদ্ধতি চালু করেছিলেন, তা আধুনিক দুর্নীতি দমন কমিশন ও অডিট ব্যবস্থার প্রাচীন রূপ। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে সরকারি পদ ও ক্ষমতা পাওয়ার পর একজন কর্মকর্তার সামনে নানা ধরনের অর্থ উপার্জনের পথ খুলে যায়, যা পদ পাওয়ার আগে ছিল না।

কেননা, ব্যক্তি স্বার্থের সঙ্গে সরকারি ক্ষমতার মিশ্রণই হলো দুর্নীতির মূল উৎস।

এই অনিয়ম রোধে তিনি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। যখনই কোনো কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিতেন, তখন দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ব মুহূর্তে তার বিদ্যমান স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তির তালিকা করে একটি সঠিক হিসাব লিখে রাখতেন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/৩০৫দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)

দায়িত্ব পালন শেষে বা পদচ্যুত করার পর তার অর্জিত সম্পদ পুনরায় অডিট বা যাচাই করা হতো। যদি সম্পদে অস্বাভাবিক কোনো বৃদ্ধি দেখা যেত, তবে খলিফা তাকে তলব করতেন এবং অতিরিক্ত অর্থের উৎস জানতে চাইতেন। (আল-বালাজুরি, আনসাবুল আশরাফ, ১০/৩১৫, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৭৯)

প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি, নিয়োগের পূর্বে সম্পদের অডিট বা হিসাব গ্রহণ, বিলাসিতা দূরীকরণ এবং সাধারণ জনগণের সরাসরি অভিযোগ শোনার ব্যবস্থা—এই চার নীতিই ছিল তার খেলাফতের মূল ভিত্তি।

উতবা ইবনে আবি সুফিয়ানকে যখন তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন, তখন তার কাছে তিরিশ হাজার দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) অর্থ পাওয়া যায়। খলিফা তাকে জিজ্ঞেস করেন, “এই বিপুল অর্থ তোমার কাছে কোত্থেকে এলো?” উতবা উত্তর দেন, “এটি বাইতুল মালের অর্থ নয়, বরং এটি আমার নিজস্ব মূলধন যা দিয়ে আমি ব্যবসা করেছি।”

কিন্তু খলিফা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “তুমি আমাদের সরকারি পদে আসীন ছিলে বলেই এই লাভের সুযোগ পেয়েছ।” অতঃপর তিনি সেই অতিরিক্ত অর্থ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মালে জমা করার নির্দেশ দেন। (ইবনে আবদি রাব্বিহি, ১/৪৫, আল-ইকদুল ফারিদ, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)

বিস্ময়কর বিষয় হলো, খলিফা ওমর (রা.) এই কঠোর নিয়মাবলি শুধু তার অধীনস্থদের ওপর চাপিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং নিজের ক্ষেত্রেও শতভাগ প্রয়োগ করেছিলেন। দীর্ঘ দিন তিনি রাষ্ট্রীয় তহবিল (বাইতুল মাল) থেকে নিজের বা পরিবারের জন্য এক দিরহামও গ্রহণ করেননি

কিন্তু পরবর্তীকালে নিজের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়লে তিনি প্রবীণ সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। আলী (রা.) তাকে পরামর্শ দেন যে, একজন খলিফা হিসেবে তিনি তার পরিবারের স্বাভাবিক আহার, গ্রীষ্ম ও শীতের সাধারণ পোশাক এবং রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারের জন্য দুটি বাহন বাইতুল মাল থেকে খোরপোশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। (তাবারি, তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ৪/২০৩, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৬৭)

খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের রাষ্ট্রকাঠামো ক্ষমতার স্বৈরাচারী বিস্তার রোধের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছিল। তিনি দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু সেই দক্ষতাকে অনিয়ন্ত্রিত হতে দেননি; আবার রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করেছেন, কিন্তু নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হতে দেননি।

তার এই ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা ও দক্ষতার যুগপৎ উপস্থিতি কতটা জরুরি।

প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি, নিয়োগের পূর্বে সম্পদের অডিট বা হিসাব গ্রহণ, বিলাসিতা দূরীকরণ এবং সাধারণ জনগণের সরাসরি অভিযোগ শোনার ব্যবস্থা—এই চার নীতিই ছিল তার খেলাফতের মূল ভিত্তি। (সালিম নুরি, কিরাআতুন ফি খিলাফাতি ওমর ইবনিল খাত্তাব, পৃ. ৮৫, মাকতাবাতুল মালিক ফাহাদ, মক্কা, ২০০২)