রাতে ঘুমানোর আগে কলা খেলে ঘুমের মান উন্নত হয়—এমন কথা অনেকের মুখে শোনা যায়। তবে এই দাবির পেছনে প্রকৃত সত্যটি কী? কলায় এমন কিছু পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান যা শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের প্রক্রিয়ায় সহায়ক হতে পারে। একটি ছোট পরিসরের গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে কলা খাওয়ার পর অংশগ্রহণকারীদের ঘুমের মানের কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে চূড়ান্তভাবে বলা যায় না যে, কলা খেলেই দ্রুত ঘুম আসবে কিংবা অনিদ্রার সমস্যা দূর হবে; কারণ এই বিষয়ে এখনো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কলায় উপস্থিত বেশ কিছু পুষ্টি উপাদান ঘুমের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। যেমন—ট্রিপটোফ্যান, যা এক ধরনের অ্যামাইনো অ্যাসিড। এটি শরীরে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন তৈরির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। মেলাটোনিন মূলত আমাদের ঘুম ও জেগে থাকার স্বাভাবিক চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। তবে কলায় ট্রিপটোফ্যানের পরিমাণ খুব বেশি নয়। এছাড়া কলায় থাকে ম্যাগনেশিয়াম, যা স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ম্যাগনেশিয়াম শরীরের সামগ্রিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করলেও, কলা খেলে সরাসরি ঘুমের উন্নতি হবে—এমন প্রমাণ সীমিত।

পটাশিয়ামের একটি সমৃদ্ধ উৎস হলো কলা, যা পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। তবে পটাশিয়ামসমৃদ্ধ কলা খাওয়ার সাথে ভালো ঘুমের সরাসরি কোনো সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পাশাপাশি এতে থাকা ভিটামিন বি৬ শরীরে ট্রিপটোফ্যান থেকে সেরোটোনিন তৈরির প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। এছাড়া কলায় থাকা কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার রাতে ক্ষুধা লাগলে হালকা নাশতা হিসেবে কার্যকর হতে পারে। এর কার্বোহাইড্রেট শক্তি জোগায় এবং ফাইবার পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, ফলে ক্ষুধার কারণে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা কিছুটা কমে।

২০২৪ সালে ‘এশিয়া প্যাসিফিক জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় অনিদ্রায় ভোগা ২১ জন ব্যক্তি অংশ নেন। তাঁদের তিনটি আলাদা দলে ভাগ করা হয়। একটি দল ঘুমানোর আগে কলা খেয়েছে, অন্য দল দুধ খেয়েছে এবং তৃতীয় দলটি তাঁদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখেছে। ছয় সপ্তাহ পর কলা ও দুধ খাওয়া দুই দলের অংশগ্রহণকারীরা জানান, তাঁদের ঘুমের মান আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। গবেষণায় ঘুমের মান যাচাইয়ের প্রশ্নমালার পাশাপাশি বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমেও অংশগ্রহণকারীদের ঘুম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। তবে কলা খাওয়া দলের মোট ঘুমের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, এমন কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

এই গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২১ জন এবং কে কোন দলে থাকবেন, তা দৈবচয়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়নি। তাই শুধুমাত্র এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে কলা খেলে ভালো ঘুম হয় বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।

রাতে ক্ষুধা লাগলে একটি ছোট বা মাঝারি আকারের কলা খাওয়া যেতে পারে। চাইলে ঘুমানোর এক থেকে দুই ঘণ্টা আগেও এটি খাওয়া যায়। তবে ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট এই সময়েই কলা খেলে সবচেয়ে বেশি উপকার মেলে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। মনে রাখা প্রয়োজন, ঘুমানোর ঠিক আগে বেশি খাবার খেলে কারও কারও অস্বস্তি হতে পারে। তাই নিজের হজম প্রক্রিয়ার সুবিধা অনুযায়ী সময় বেছে নেওয়াই শ্রেয়।

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে রাতে কলা খেলে ওজন বাড়ে কি না। আসলে শুধু রাতে কলা খাওয়ার কারণে ওজন বাড়ে না। ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস মূলত দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় কতটা ক্যালরি গ্রহণ করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে। একটি মাঝারি আকারের কলায় প্রায় ১০৫ ক্যালরি, ২৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট ও ৩ গ্রাম ফাইবার থাকে। তবে কলার আকার ও জাতভেদে পুষ্টিমান কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

দিনের অন্য সময়ের মতো রাতেও পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়া যায়। রাতের খাবারের পর মিষ্টিজাতীয় খাবারের বিকল্প হিসেবে একটি কলা বেছে নেওয়া যেতে পারে। কলা একটি পুষ্টিকর ফল এবং রাতে ক্ষুধা লাগলে এটি হালকা নাশতা হিসেবে উপযুক্ত। তবে ভালো ঘুমের জন্য শুধু খাবারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।

সুস্থ ঘুমের জন্য প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করা জরুরি। শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখা প্রয়োজন। বিকেল বা সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং ঘুমানোর অন্তত আধা ঘণ্টা আগে মুঠোফোন ও কম্পিউটারের ব্যবহার বন্ধ রাখার চেষ্টা করা উচিত। নিয়মিত ঘুমের সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, কলা স্বাস্থ্যকর খাবার হতে পারে; কিন্তু ঘুমের ওষুধ কিংবা অনিদ্রার চিকিৎসার বিকল্প নয়।