গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে। এই নতুন বিধিমালা প্রকাশের পরপরই রাজধানী ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আজ মঙ্গলবার থেকে আবেদন ফরম বিক্রি শুরু করবে। অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালুর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। নতুন এই বিধিমালা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নিতে পারবেন।

তবে কেবল আবেদন করলেই নিবন্ধন পাওয়া যাবে না। আবেদনকারীকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার রিকশাটি ফিটনেস এবং কারিগরি দিক থেকে ত্রুটিমুক্ত। রিকশাটির কারিগরি মান ও নিরাপত্তার শর্তাবলি পূরণ হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে প্রয়োজনীয় সনদ প্রদান করবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

বর্তমানে ঢাকা শহরে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত রিকশাদের মালিকানা মূলত দুই ধরনের। কিছু রিকশার চালক নিজেই মালিক, ফলে আয়ের পুরো অংশ তার কাছেই থাকে; তবে তাকে ব্যাটারি চার্জ এবং গ্যারেজ ভাড়া আলাদাভাবে দিতে হয়। অন্যদিকে, বিত্তশালী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তির অধীনে ৫০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত রিকশা থাকে। এই মালিকরা গ্যারেজ ও চার্জিং ব্যবস্থার দায়িত্ব নেন এবং চালকদের নির্দিষ্ট দৈনিক ‘জমা’র বিনিময়ে রিকশা ভাড়া দেন।

সংশ্লিষ্ট চালক ও মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় মোটা চাকা, সাধারণ চাকা এবং বিভিন্ন আকারের নানা ধরনের রিকশা চলাচল করে। এসব রিকশার দৈনিক জমা ৩০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। এই জমা, চার্জ এবং গ্যারেজ ভাড়া বাদ দিয়ে একজন চালক দৈনিক এক থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। নতুন রিকশায় বিনিয়োগ বেশি হওয়ায় মালিকের জমার পরিমাণও বেশি হতে পারে। এছাড়া চালকের আয় নির্ভর করে তিনি কোন এলাকায় রিকশা চালাচ্ছেন তার ওপর।

সাধারণত দেশে মোটরযানের নিবন্ধন দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), তবে রিকশার নিবন্ধন দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সিটি করপোরেশনের ওপর। বিআরটিএ, পুলিশ, যাত্রী অধিকার সংগঠন এবং অন্যান্য অংশীজনদের হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে ব্যাটারি ও যন্ত্রচালিত তিন চাকার অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে প্রায় ৫০ লাখ এবং রাজধানীতে প্রায় ২০ লাখ রিকশা রয়েছে।

বড় শহরগুলোতে এখন পায়ে চালিত রিকশার জায়গা দখল করেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, যা যাত্রীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। দীর্ঘদিনের দাবির পর স্থানীয় সরকার বিভাগের এই বিধিমালা প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই নতুন ব্যবস্থায় নিবন্ধনের নিয়ম, চলাচলের শর্ত এবং কারিগরি দিকগুলো নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, কারণ এর সাথে ঢাকা ও বড় শহরের বিপুল সংখ্যক যাত্রী, চালক ও মালিক জড়িত।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান কার্যালয় নগর ভবন এবং সব আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে আজ মঙ্গলবার ১০০ টাকা দিয়ে আবেদন ফরম সংগ্রহ করা যাবে। তবে ফরম সংগ্রহ করলেই নিবন্ধন সনদ দেওয়া হবে না; আবেদন এবং বাহন যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত সনদ প্রদান করা হবে।

ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাবিবুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “তাঁরা নিবন্ধনের ফরম ছাপাতে দিয়েছেন। কাল সকালে এ বিষয়ে বৈঠক হবে। এরপর রিকশা নিবন্ধনের ফরম কবে বিক্রি শুরু হবে, তা ঘোষণা করা হবে।”

বিধিমালা অনুযায়ী, আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং বয়স অন্তত ১৮ বছর হতে হবে। কোনো ব্যক্তি যদি উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হন, তবে তিনি আবেদন করতে পারবেন না। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একজন সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নিতে পারবেন, যা এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়ে হিসাব করা হবে। অর্থাৎ, ভিন্ন ভিন্ন সিটিতে আবেদন করে পাঁচটির বেশি রিকশা নিবন্ধন করা সম্ভব হবে না। এছাড়া এক সিটিতে নিবন্ধিত রিকশা অন্য সিটিতে চলাচল করতে পারবে না।

নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরমের সাথে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, সদ্য তোলা দুই কপি সত্যায়িত পাসপোর্ট আকারের ছবি, নিবন্ধন ফি জমার রসিদ এবং নির্ধারিত ছকে ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র ও কারিগরি মান যাচাই করে শর্ত পূরণ হলে আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন প্রদান করবে। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিল করার সুযোগ থাকবে।

বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড, নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য এবং অনুমোদিত নকশার শর্ত পূরণ করলেই ই-রিকশা নিবন্ধন পাবে। ফিটনেস সনদে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক। বিধিমালায় পুরোনো সব রিকশা বাতিল করে নতুন রিকশা কেনার কথা বলা হয়নি। বর্তমানে চলাচলরত রিকশাও অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পরিবর্তন করে এবং প্রয়োজনীয় ফিটনেস সনদ নিয়ে নিবন্ধনের আওতায় আসতে পারবে। পরিবর্তনের পর তা মানদণ্ড পূরণ করছে কি না, তা পুনরায় পরীক্ষা করা হবে।

কোনো প্রতিষ্ঠান কেবল বুয়েটের নির্দেশনা মেনে রিকশা তৈরির দাবি করলেই নিবন্ধন নিশ্চিত হবে না। সংশ্লিষ্ট মডেলের অনুমোদন ও ফিটনেস পাওয়ার উপযোগিতা যাচাই করবেন বুয়েট ও ট্রাফিক পুলিশ। ঢাকা দক্ষিণের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেছেন, “শুধু ফরম সংগ্রহ করলেই নিবন্ধন পাওয়া যাবে না। নির্ধারিত শর্ত, বুয়েটের কারিগরি মানদণ্ড ও যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ বাহনকেই সনদ দেওয়া হবে।”

নিবন্ধন ফি হিসেবে দুই যাত্রীর ই-রিকশার জন্য ৮ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চার যাত্রীর ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা। এছাড়া ফিটনেস সনদের ফি ১ হাজার টাকা।

বিধিমালা অনুযায়ী নিবন্ধনের মেয়াদ পাঁচ বছর এবং রিকশার আয়ুষ্কাল ১২ বছর। নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হলে একই নম্বরে আরেকটি রিকশা নামানো যাবে, তবে আয়ুষ্কাল শেষ হলে নম্বরপ্লেটসহ নিবন্ধন বাতিল হবে। প্রতিটি নিবন্ধিত বাহনে কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বরপ্লেট থাকবে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে আটটি অঞ্চলে ভাগ করার কথা বলেছে। ট্রাফিক পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা এই সীমানা নির্ধারণ করবেন। এক অঞ্চলের রিকশা অন্য অঞ্চলে চলতে পারবে না এবং প্রতিটি অঞ্চলের রিকশার রং আলাদা হবে।

ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যস্ত এলাকায় এই গতিসীমা হবে ১৫ কিলোমিটার। মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট করিডর এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সড়কে এই রিকশা চলতে পারবে না।

চার্জিং স্টেশনের জন্যও আলাদা নিবন্ধন নিতে হবে, যার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রয়োজন। অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অনুমোদনহীন ব্যাটারি ব্যবহার এবং বিপজ্জনকভাবে রিকশা চালালে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি গবেষক দল রিকশার একটি নকশা তৈরি করেছেন। দেশে প্রচলিত ১২ ধরনের ব্যাটারিচালিত রিকশার নিরাপত্তা ত্রুটি পর্যালোচনা করে এতে ১৬টি বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়েছে। নকশায় তিন চাকায় হাইড্রোলিক ডিস্ক ব্রেক ও বিকল্প পার্কিং ব্রেক, পেছনের আয়না, মোড় নেওয়ার সংকেতবাতি, ছাউনি, সামনের কাচ এবং স্থায়ী হেডলাইট রাখা হয়েছে।

অধ্যাপক এহসান গতকাল সোমবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অন্তত এক ডজন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাদের রিকশার ‘টাইপ’ অনুমোদন নিয়েছে। আরও ১০ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহী। তাদের অনুমোদিত নকশায় রিকশা নামলে নিরাপত্তাঝুঁকি কমবে। বিধিমালা মেনে চলাচল করলে শৃঙ্খলাও আসবে।”

বুয়েটের নির্দেশনা অনুযায়ী রিকশা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, একটি রিকশা তৈরিতে খরচ হবে প্রায় দেড় লাখ টাকা। এর সাথে যুক্ত হবে ব্যাটারির খরচ, যার দাম মানভেদে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

বাজার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় বাণিজ্যিক নিবন্ধনযুক্ত সিএনজি অটোরিকশার দাম ১৮ থেকে ২২ লাখ টাকা। দুই পালায় দৈনিক জমা ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা হলেও সরকার নির্ধারিত জমা ৯০০ টাকা। ফলে এই চালকদের বিরুদ্ধে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, মালিক ও চালকরা নিবন্ধন পাওয়ার পর বিধিমালা মেনে ই-রিকশা চালান কি না। তা না হলে সিএনজি অটোরিকশার মতো নতুন রিকশাতেও দৌরাত্ম্য শুরু হতে পারে।