পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা, গার্ড অব অনার ও দাফন কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
সোমবার (২ নভেম্বর) চট্টগ্রামের মিরসরাইসহ ঝালকাঠি, মাগুরা, ভোলা, গাইবান্ধা, যশোর ও কিশোরগঞ্জ জেলায় এসব কর্মসূচি পালিত হয়। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয় এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তোলা হয়।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই প্রেসক্লাবের সামনে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মানববন্ধনে অংশ নেন। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক মো. লিয়াকত আলী খানের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম আহ্বায়ক নুর উদ্দিনের সঞ্চালনায় এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবুল হাশিম, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সদস্য সচিব রবিউল হোসেন এবং কাটাছরা ইউনিয়ন কমান্ডার আবুল হোসেন মাস্টার।
বক্তারা বলেন, “মুক্তিযোদ্ধারা কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর সম্পদ নন, তারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের পবিত্র দায়িত্ব। দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, মৃত্যুর পর তাদের জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও দুঃখজনক। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি এমন অসম্মান কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ঝালকাঠিতে সোমবার সকালে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের সামনে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ঝালকাঠি কমান্ডের ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর, জেলা কমান্ডার মোস্তফা কামাল মন্টু ও সদস্যসচিব সত্যবান সেনগুপ্ত। বক্তারা বলেন, “একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মান, জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়।” তারা এ ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
মাগুরায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মো. আব্দুল ওহাবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুর রহমান, শ্রীপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুস কুদ্দুস মুন্সি, মহম্মদপুর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক মতিউর রহমানসহ অন্যান্যরা। বক্তারা মানিক পশারীর গার্ড অব অনার ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনাকে ন্যক্কারজনক উল্লেখ করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
ভোলার ক্ষেত্রে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে ভোলা প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে জেলার বিভিন্ন উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। বক্তারা ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। এর আগে শনিবার ভোলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে এক প্রস্তুতি সভায় এ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সভায় বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন বাচ্চু, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সাদেক, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন শাহাজান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমানসহ অন্যান্যরা। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা সন্তানসহ বিভিন্ন ইউনিটের কমান্ডাররা এতে অংশগ্রহণ করেন।
গাইবান্ধা জেলা শহরের ডিবি রোডে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, গাইবান্ধা সদর উপজেলা কমান্ডের আয়োজনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সদর উপজেলা কমান্ডের আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম খোকার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল আলম সাজা, সাবেক জেলা কমান্ডার মুজিবুল হক ছানাসহ অন্যরা। বক্তারা বলেন, “একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়া লজ্জাজনক ও অমানবিক।” তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তির দাবি জানান।
যশোর শহরের দড়াটানা ভৈরব চত্বরে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে মানববন্ধন ও গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যশোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক আব্দুল লতিফের সভাপতিত্বে এই সমাবেশে বক্তব্য দেন তৌহিদ আহমেদ, যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি একরাম উদ্দৌলা, সদর উপজেলা কমান্ডের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হারুন অর রশিদ, জাসদ নেতা রবিউল আলম, সাবেক জেলা কমান্ডার এ এইচ এম মুজাহারুল ইসলাম মন্টু, বাসদ নেতা হাচিনুর রহমান এবং প্রেসক্লাব যশোরের সাধারণ সম্পাদক নুর ইসলাম।
বক্তারা বলেন, “একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা, দাফন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানে বাধা দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এটি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও মর্যাদার প্রতি চরম অবমাননা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষায় ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।”
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম চত্বরে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কিশোরগঞ্জ জেলা কমান্ডের ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে জেলার ১৩টি উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। বক্তব্য দেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্যসচিব মো. হাবিবুর রহমান, সাবেক জেলা কমান্ডার মো. আসাদউল্লাহসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধা নেতারা। মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
বক্তারা বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মান, জানাজা ও দাফন নিয়ে এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে চলে যান ৮৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। গত ২৪ অক্টোবর টুঙ্গিপাড়ায় তার মৃত্যু হয়। পরে পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলে জামায়াত সমর্থিত কর্মীরা আপত্তি জানান বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর পুলিশ লাইনে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। গভীর রাতে পুলিশি পাহারায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়।
মানিক পশারী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন। ওই মামলায় সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।