পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন এবং রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদানে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বাধা দেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দেশের ২৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক। এই অমানবিক ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদার পাঠানো এক বিবৃতিতে এই দাবি উত্থাপন করা হয়।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, "গত ২৪ অক্টোবর বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাকে গার্ড অব অনার প্রদান এবং দাফনকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক, অনভিপ্রেত ও নিন্দনীয়।"
বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে ওই বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রথমবার কবর খোঁড়ার পর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা সেটি ভরাট করে দেন। পরবর্তীতে আনুমানিক রাত ২টার পর মানিক পশারীর মেয়ে ও দুই বোন গ্রাম পুলিশের সহায়তায় মোবাইল ফোনের আলোয় পুনরায় কবর খুঁড়তে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর পুলিশি নিরাপত্তায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।
বিবৃতিদাতাদের মতে, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন এবং উদ্বেগের জন্ম দেয়।
তারা জানান, পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা মানিক পশারী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে গোপালগঞ্জে মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই গত ২৪ অক্টোবর তার মৃত্যু হয়। রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে গার্ড অব অনার প্রদানের মাধ্যমে দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দাফনে বাধা দেওয়া হয় বলে বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে।
কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর যথাযথ মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন করার অধিকার মৌলিক মানবাধিকারের অংশ বলে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, "কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, এমনকি রাষ্ট্রও এই অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে না।"
পরবর্তী সময়ে পিরোজপুর পুলিশ লাইনে মানিক পশারীর মরদেহে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। তবে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বাধার কারণে প্রায় ১৫ ঘণ্টা তার দাফন বিলম্বিত হয় বলে দাবি করা হয়েছে ওই বিবৃতিতে।
২৮ জন নাগরিকের মতে, রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া কোনো ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা কি না, তা নির্ধারণ করার এখতিয়ার কেবল রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে সংশ্লিষ্ট স্বীকৃতি যাচাই-বাছাই করতে পারে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন নিজ উদ্যোগে কারও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নির্ধারণ বা সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে তার দাফনে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল উল্লেখ করে তারা বলেন, দলটির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আদালতের বিচারে প্রমাণিত হয়েছে। এসব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পরও কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মানিক পশারীর সঙ্গে সংঘটিত এই কর্মকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধের শামিল হতে পারে। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা অতীতের ভূমিকার কারণে তার জানাজা ও দাফনে বাধা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
মৃত ব্যক্তির যথাযথ মর্যাদায় সৎকার করা ইসলামসহ সব ধর্মেরই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা জানিয়ে বিবৃতিদাতারা বলেন, "সেই শিক্ষাকে উপেক্ষা করে মানিক পশারীর প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা জানা নেই।"
ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে উপযুক্ত এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন:
১. অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন
২. খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি
৩. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি
৪. অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
৫. শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
৬. রাশেদা কে চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণস্বাক্ষরতা অভিযান
৭. শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী
৮. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
৯. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১০. ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১১. ড. তানজীমউদ্দিন খান, অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১২. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৩. রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৪. ড. স্বপন আদনান, ভিজিটিং প্রফেসর, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স
১৫. ড. নোভা আহমেদ, অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
১৬. রেহনুমা আহমেদ, লেখক ও গবেষক
১৭. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৮. অ্যাডভোকেট তবারক হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৯. অ্যাডভোকেট সালমা আলী, নির্বাহী পরিচালক, বি এন ডব্লিউ এল এ
২০. মো. নুর খান, মানবাধিকারকর্মী
২১. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক
২২. রোজিনা বেগম, গবেষক ও অধিকারকর্মী
২৩. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ
২৪. অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন
২৫. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকারকর্মী
২৬. দীপায়ন খীসা, মানবাধিকারকর্মী
২৭. ড. হানা শামস আহমেদ, অধিকারকর্মী
২৮. মুক্তাশ্রী চাকমা, অধিকারকর্মী