১৯১৭ সালে রাজশাহীর তানোরের তালন্দ জমিদারবাড়িতে জন্ম নেওয়া রাধিকামোহন মৈত্র ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক প্রাজ্ঞ সাধক ও শ্রদ্ধেয় আচার্য। তাঁর জীবন, সংগীতসাধনা, অর্জিত জ্ঞান এবং উত্তরাধিকারের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তাঁর জীবনীকার ও সুযোগ্য শিষ্য, প্রখ্যাত সরোদবাদক সোমজিৎ দাশগুপ্ত। সেই বিশেষ কথোপকথনের দ্বিতীয় কিস্তিটি এখানে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন খান মো. রবিউল আলম।
খান মো. রবিউল আলম: রাধিকামোহন মৈত্রের ওস্তাদ মোহাম্মদ আমীর খাঁ সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি
সোমজিৎ দাশগুপ্ত: “ওস্তাদ মোহাম্মদ আমীর খাঁ একজন ঋষি ও সিদ্ধশিল্পী ছিলেন। বলা হতো উনি বালকৃষ্ণের (সনাতন ধর্মে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শিশু বা বালক রূপকে বালকৃষ্ণ বলা হয়) সঙ্গে থাকেন, বালকৃষ্ণের কাছে থাকেন। উনাকে রাজা নবকৃষ্ণের কিছু লোক বলেছিলেন, আপনি নাকি বালকৃষ্ণকে দেখাতে পারেন। উনি বলছিলেন, হ্যাঁ পারি। তবে আমাকে দেখতে হবে তোমাদের মধ্যে কে কে সেটা নিতে পারবে। জানত কৃষ্ণ মানে বিষ্ণু, বালকৃষ্ণ হোক বা যে–ই হোক ওটা বিশ্বরূপ দর্শন।”
রাজা নবকৃষ্ণের বাড়ির সামনে নাটমন্দিরে একবার বাজিয়েছিলেন ওস্তাদ মোহাম্মদ আমীর খাঁ। সেখানে প্রায় চল্লিশজন মানুষ উপস্থিত ছিলেন, যাদের মধ্যে ভগবান চন্দ্র সেনও ছিলেন। উল্লেখ্য, স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্য ভগবান চন্দ্র সেন ছিলেন রামকৃষ্ণ ঠাকুরের পরম্পরার একজন মহাসংগীতজ্ঞ ও পরিব্রাজক সংগীতজ্ঞ। সেই অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আমীর খাঁ বাংলার বর্ষাকালীন গৌড়মল্লার রাগটি বাজিয়েছিলেন।
রবিউল: কী ঘটেছিল সেখানে?
সোমজিৎ: “আশপাশের লোকদের ওস্তাদ আমীর খাঁ ৩০-৪০ ফুট দূরত্বে বসতে বলেছিলেন। সুর তোলার সঙ্গে সঙ্গে ওই ফাঁকা জায়গায় ঝড়, বৃষ্টি, জল বইতে শুরু করল। জলের টেউয়ের ভেতর একটা বাচ্চা ছেলে হামাগুড়ি দিয়ে এদিক-সেদিক যাচ্ছে। সবাই তা দেখল। বাচ্চা ছেলেটার মাথায় ময়ূরের পালক ছিল। ধীরে ধীরে যখন ওস্তাদ আমীর খাঁ বাজনা বন্ধ করলেন বাচ্চা ছেলেটি সরে গেল। জলটল আর কিছু দেখা গেল না। অন্যেরা স্যাঁতসেঁতে যে ব্যাপার অনুভব করেছিলেন সেটাও আর থাকল না। এই হলেন ওস্তাদ মোহাম্মদ আমীর খাঁ। তাঁর রাগের খেলা।”
ওস্তাদ মোহাম্মদ আমীর খাঁ রাধিকামোহন মৈত্রের পিতা ব্রজেন্দ্রমোহন মৈত্রকে অনুরোধ করেছিলেন, “অনেক তো ঘরের ভেতর থাকলাম, আপনাদের কৃষ্ণঠাকুরের যে মন্দির রয়েছে, তার মাঝে আমাকে একটা ঘর করে দিতে পারবেন। আমি কৃষ্ণঠাকুরের কাছে থাকতে চাই।” তিনি ছিলেন সেই পর্যায়ের শিল্পী। রেকর্ড করার প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে তাঁর শিষ্যদের তালিকায় তিমির বরণ ভট্টাচার্য, নীরেন্দ্র কৃষ্ণ মিত্র, আশুতোষ কুন্ডু, ননী গোপাল মতিলাল, হাফিজ আলী খান এবং রাধিকামোহন মৈত্রের মতো খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞরা ছিলেন। আমীর খাঁ তাঁর সমস্ত জ্ঞান শিষ্যদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সুরকার হিসেবে তিনি তাঁর পিতা আবদুল্লাহ খান এবং চাচা মুরাদ আলী খানের মতোই অত্যন্ত সৃজনশীল ছিলেন। তাঁরা তিনজন মিলে পাঁচ শ’র বেশি গীত রচনা করেছিলেন।
একবার ওস্তাদ মোহাম্মদ আমীর খাঁ শিশু রাধিকামোহন মৈত্রকে কোলে তুলে নিয়ে ব্রজেন্দ্রমোহন মৈত্রের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, “একে আমায় দিতে হবে।” এতে ব্রজেন্দ্রমোহন মৈত্র কিছুটা চিন্তিত হয়ে বলেন, “সে ও রকম হয়ে গেলে কে জমিদারি দেখবে? আমি যা শিখেছি তা ঠিক আছে।” তবে ওস্তাদ আমীর খাঁ অনড় থেকে বলেন, “সবই হবে, ওকে আমায় দিন।”
রবিউল: রাধিকামোহন মৈত্রের সঙ্গে ওস্তাদ মোহাম্মদ আমীর খাঁর সংযোগ হলো কীভাবে?
সোমজিৎ: রাধিকামোহন মৈত্রের বাবা ব্রজেন্দ্রমোহন মৈত্র ওস্তাদ আমীর খাঁর কাছে সরোদ শিক্ষা গ্রহণ করতেন। তখন রাধিকামোহন মৈত্রের বয়স ছিল মাত্র চার বছর। সেই বয়সেই তিনি হাত দিয়ে সরোদের প্লেট ঘষছিলেন এবং রাগ কাফির একটি রচনা টিংটিং করে বাজাচ্ছিলেন। এটি দেখে আমীর খাঁ বুঝতে পারেন যে শিশুটি কোনোদিন শিক্ষা নেয়নি, কেবল শুনেই এটি আয়ত্ত করেছে। এরপরই তিনি ব্রজেন্দ্রমোহন মৈত্রের কাছে রাধিকামোহনকে তাঁর তত্ত্বাবধানে দেওয়ার অনুরোধ জানান। ব্রজেন্দ্রমোহন মৈত্র প্রথমে জমিদারি পরিচালনার কথা ভেবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বলেন, “সে ও রকম হয়ে গেলে কে জমিদারি দেখবে? আমি যা শিখেছি তা ঠিক আছে।” কিন্তু ওস্তাদ আমীর খাঁ আশ্বস্ত করে বলেন, “সবই হবে, ওকে আমায় দিন।” শেষ পর্যন্ত তা-ই হয় এবং চার বছর বয়সেই রাধিকামোহন মৈত্রের সরোদ শিক্ষা শুরু হয়। ১০ বছর বয়সে পৌঁছালে আমীর খাঁ রাধু বাবুকে জানান যে এখন থেকে তাঁর শিক্ষা ভিন্ন হবে। রাধিকামোহনের নিজের ভাষায়, “১০ থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত অজস্র রাগ-রাগিণী, গত্-বন্দিশ, কম্পোজিশন, রচনা, যন্ত্রসংগীত, ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুমরি ওস্তাদ শিখিয়েছিলেন।” এভাবেই শাস্ত্রীয় যন্ত্রসংগীতে তাঁর মজবুত ভিত্তি তৈরি হয়।
রবিউল: শুনেছি রাধিকামোহন মৈত্রের ছোট রবীন্দ্রমোহন মৈত্র ওস্তাদ মোহাম্মদ আমীর খাঁর কাছে শিখতেন। একটু বিস্তারিত বলবেন?
সোমজিৎ: রাধিকামোহন মৈত্রের ছোট ভাই রবীন্দ্রমোহন মৈত্রও ওস্তাদ আমীর খাঁর কাছে সরোদ শিক্ষা নিয়েছিলেন এবং তিনি অত্যন্ত দক্ষভাবে বাজাতেন। ছোটবেলায় তাঁর বাজনা শোনার অভিজ্ঞতা আমার আছে। রবীন্দ্রমোহন মৈত্র আমীর খাঁকে নিয়ে একটি চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছিলেন। মোহাম্মদ আমীর খাঁর স্ত্রী মুন্নি বাই নিজেও একজন সংগীতবোদ্ধা ছিলেন। অনেক সময় আমীর খাঁ কোনো ঠুমরি বা খেয়াল মনে করতে না পারলে বলতেন যে তিনি একটু ঘর থেকে ঘুরে আসছেন। আসলে তিনি ঘরে গিয়ে স্ত্রীর কাছে জিজ্ঞেস করে বিষয়টি জেনে নিতেন এবং ঝালিয়ে নিতেন। এতেই বোঝা যায় মুন্নি বাই কত বড় মাপের শিল্পী ছিলেন।
রবিউল: ওস্তাদ মোহাম্মদ আমীর খাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং রাধিকামোহনের অন্যান্য গুরুর সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি?
সোমজিৎ: ওস্তাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি সরোদ, ধ্রুপদ ও খেয়াল শেখাতেন। পাশাপাশি উনিশ শতকের প্রখ্যাত বাঙালি পাখোয়াজ বাদক ও সংগীতজ্ঞ ভগবান চন্দ্র সেন ছিলেন রাধিকামোহন মৈত্রের পাখোয়াজ গুরু। তিনি তালিমের সময় রাধু বাবুকে মাথা তুলতে দিতেন না এবং দিনে সাত-আট ঘণ্টা বসিয়ে রেওয়াজ করাতেন। এর মাঝে আমীর খাঁ মাঝেমধ্যে এসে তালিম দিতেন।
এর পাশাপাশি ছিল স্কুলের পড়াশোনা। দুরন্ত স্বভাবের শিশু রাধিকামোহন খেলাধুলার জন্য খুব কম সময় পেতেন। তিনি গাছে উঠতেন এবং সুযোগ পেলেই বেরিয়ে যেতেন। তখন তাঁকে ধরে আনতে হতো। আমীর খাঁ অনেক সময় তাঁকে পাঁজাকোলা করে তুলে আনতেন এবং ভগবান চন্দ্র সেন তাঁর কান ধরে নিয়ে আসতেন। এমন এক কঠিন শাসন ও শিক্ষাপদ্ধতির মধ্য দিয়ে গেছেন রাধিকামোহন মৈত্র। ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি সরোদ, সেতার ও সুরশিঙ্গার মতো যন্ত্র শিখতে সময় ব্যয় করেন।
২০ বছর বয়সে তাঁর কাছে শিক্ষাদান করতে আসেন ওস্তাদ মহম্মদ দবীর খাঁ। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী, যিনি মূলত রুদ্র বীণা বাদন এবং ধ্রুপদ কণ্ঠসংগীতের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ মিয়া তানসেনের রামপুর সেনিয়া ঘরানার সর্বশেষ প্রত্যক্ষ বংশধরদের একজন ছিলেন তিনি। এভাবে কঠোর শাসনের মধ্য দিয়ে রাধিকামোহন মৈত্রের রক্তে সংগীতের বিভিন্ন ধারার সংমিশ্রণ ঘটে এবং তিনি অনন্য হয়ে ওঠেন।
রবিউল: শুনেছি রাধিকামোহন মৈত্রের মা সেতার শিখতেন ওস্তাদ এনায়েত খাঁর কাছে, সেই সম্পর্কে যদি একটু বলেন?
সোমজিৎ: রাধিকামোহন মৈত্রের মা বীণাপাণি মৈত্র ওস্তাদ এনায়েত খাঁর কাছে সেতার শিখতেন। এনায়েত খাঁ ছিলেন ওস্তাদ বেলায়েত খাঁর পিতা এবং তিনি ওস্তাদ মোহাম্মদ আমীর খাঁকে চাচা বলে সম্বোধন করতেন। এনায়েত খাঁ রাধিকামোহন মৈত্র সম্পর্কে আমীর খাঁকে বলেছিলেন, “এমন জওয়ান সাগরেদ আপনি তৈরি করেছেন। আপনি তাকে সেতার শিখিয়েছেন কিন্তু আমি আমার মতো করে একটু কিছু ওকে দিতে চাই।” রাধিকামোহন মৈত্র এনায়েত খাঁর কাছে সেতার শিক্ষা লাভ করেন। বেলায়েত খাঁ আমাকে বলেছিলেন, “আমার বাবার সেতারের বাজ আমার চেয়ে রাধু বাবু অনেক ভালো জানতেন।” একবার একটি অনুষ্ঠানে এনায়েত খাঁ ও রাধিকামোহন মৈত্র যুগলবন্দী বাজিয়েছিলেন, যেখানে উপস্থিত শ্রোতারা বলেছিলেন যে তাঁদের বাদনশৈলীতে সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটেনি। ঠাকুরদা, বাবা, মা ও ভাইয়ের সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা এক সমৃদ্ধ সাংগীতিক আবহ থেকেই রাধিকামোহন মৈত্রের উত্থান ঘটে।
রবিউল: রাধিকামোহন মৈত্রের সাধনার পিউরিটি বা বিশুদ্ধতা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি?
সোমজিৎ: বিশুদ্ধতার বিষয়ে রাধিকামোহন মৈত্র অত্যন্ত মেটিকুলাস বা খুঁতখুঁতে ছিলেন। তিনি ছিলেন নীরব, পরিশীলিত এবং প্রচারবিমুখ। বাহ্যিক জাঁকজমক বা হুম্বিতম্বি ব্যাপার তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল না। তিনি ছিলেন একজন আত্মস্থসাধন শিল্পী। ভারতীয় সংগীতে, বিশেষ করে যন্ত্রসংগীতে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করে একে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর রচিত কণ্ঠসংগীতের গত্, বন্দিশ ও রচনাগুলোও অনন্য। তাঁর মতে, রাগ ও ধ্রুপদ, নামার, খেয়াল, ঠুমরি, কাজরী ও চৈত্রী সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকলে তবেই রাগটি যথাযথভাবে যন্ত্রসংগীতে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
তিনি বহু ধরণের যন্ত্র বাজাতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য ও ভারতের প্রথম সংস্কৃতিমন্ত্রী অনীল চন্দ একবার রাধিকামোহনের সঙ্গে চীনে গিয়েছিলেন। সেখানে সংগ্রহশালায় এমন দু-তিনটি যন্ত্র দেখেছিলেন যা তিনি আগে কখনো দেখেননি। অনুমতি নিয়ে রাধিকামোহন সেই যন্ত্রগুলো এত সুন্দরভাবে বাজিয়েছিলেন যে পুরো ঘর ভরে উঠেছিল। কোনো যন্ত্র হাতে নিলে তা বুঝতে তাঁর সামান্য সময় লাগত এবং এরপরই তিনি তা বাজিয়ে তুলতে পারতেন। যন্ত্রের ব্যাপারে তাঁর এমন প্রাজ্ঞতা ছিল যে, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে রাধিকামোহন মৈত্রকে “নীরব রবীন্দ্রনাথ” বলে অভিহিত করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। সংগীতের প্রচারের ব্যাপারে তিনি ছিলেন ভীষণ নীরব, তবে তাঁর আত্মস্থকরণের শৈলী ছিল অসাধারণ। রাধিকামোহন মৈত্রের যে নিজস্ব শৈলী তৈরি হয়েছিল, তা আমরা চার প্রজন্ম ধরে বয়ে চলেছি। (চলবে)