১৯১৭ সালে রাজশাহীর তানোরের তালন্দ জমিদারবাড়িতে জন্ম নেওয়া ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাজ্ঞ সাধক আচার্য রাধিকামোহন মৈত্রে। সংগীতের জগতে তাঁর অনন্য অবদান এবং গভীর জ্ঞানচর্চার জন্য তিনি সমাদৃত। তাঁর ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর জীবনদর্শন, সংগীতসাধনা, উত্তরাধিকার এবং সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তাঁর জীবনীকার ও শিষ্য, প্রখ্যাত সরোদবাদক সোমজিৎ দাশগুপ্ত। এই বিশেষ আলাপচারিতার সঞ্চালক ছিলেন খান মো. রবিউল আলম।

আচার্য রাধিকামোহন মৈত্রে সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের ধারণা দিতে গিয়ে সোমজিৎ দাশগুপ্ত বলেন, “ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত কত পুরোনো, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ৬, ৭ বা ১০ হাজার বছরের পুরোনো হতে পারে। ভারতীয় সভ্যতা ও এর প্রাচীনত্ব বারবার উন্মুক্ত হচ্ছে। এটা কালজয়ী বা সময়োত্তীর্ণ, সুতরাং এখানে যাঁরা আচার্য, ঋষি, শিল্পী—তাঁদের কাজগুলোও কালোত্তীর্ণ। সেই পরম্পরাটি এভাবে চলে আসছে বলেই এ ধারাটি এত সমৃদ্ধ। যেসব ঋষি-শিল্পী কিংবদন্তি হয়ে গেছেন, তাঁরা কোনো প্রজন্মে হয়তো ৫০০ বছর বা ১ হাজার বছর আলোকিত বা কম শ্রুত হতে পারেন, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে রাধিকামোহন মৈত্রের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, “রাধিকামোহন মৈত্রের উপস্থিতি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে অনেকটা পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী ব্যাকরণের মতো, যা ছাড়া প্রাচীন ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে না। রাধিকামোহন মৈত্রকে বাদ দিলে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত নানা রকমের আলো হারায়। বিষয়টি আধুনিক প্রজন্ম কতটা মনে রাখছে বা রাখছে না, তাতে কিছু আসে যায় না। এটা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস আরণ্যক-এর মতো। কতজন এ উপন্যাসের কথা জানেন তাতে কি উপন্যাসটির কিছু যায় আসে? কিন্তু বাংলা সাহিত্যের যায় আসে। আরণ্যক-এর মতো বন নিয়ে দ্বিতীয় উপন্যাসটি হয়তো আর লেখা হবে না। তেমনই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে রাধিকামোহন মৈত্রের মতো আরেকজন পাওয়া খুব মুশকিল। আমার খুব শ্রদ্ধেয় শিল্পী রিতা গাঙ্গুলি বলেছেন, ‘উনি তো অবতারতুল্য।’ তো ও রকম যাঁরা হন তাঁরা তো অনেক প্রজন্মজুড়ে থাকতে এসেছেন কাজ নিয়ে, উপস্থিতি নিয়ে, শ্রদ্ধা নিয়ে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় যন্ত্রসংগীতের রাগের বিশুদ্ধতা, বিরাটসংখ্যক রাগের প্রসার এবং অনেকগুলো বন্দিশ কম্পোজিশনে রাধিকামোহন মৈত্র বিশেষভাবে সমাদৃত। আরেকটি হলো রাগের বিশুদ্ধতা, যা দিয়ে রাগের সাধনা হয়, সার্থক সাধনা হয়। বিশুদ্ধতার চর্চা রাধিকামোহন মৈত্র করেছেন।”

শিষ্যদের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতা প্রসঙ্গে সোমজিৎ দাশগুপ্ত বলেন, “রাধিকামোহন মৈত্র নিজের কর্তব্য করে গেছেন। তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম, মানে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে আমরা করছি। আমরা গুরুকৃত্যের কর্তব্য করছি। আকাশ তো আকাশই থাকে। আকাশের নিচ দিয়ে কোটি কোটি লোক হাঁটাচলা করে, লোকেরা মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল কি না, আকাশটাকে দেখল কি না তাতে আকাশের কি কিছু আসে যায়? আমাদের শাস্ত্রীয় সংগীতে তাঁর উপস্থিতি ওই আকাশের মতো। আকাশ না থাকলে পৃথিবীর বারোটা বেজে যাবে। তেমনি তাঁরা না থাকলে মানুষ আবার গুহাবাসের সময়ে পৌঁছে যাবে।”

তিনি আরও জানান, রাধিকামোহন মৈত্রে ছিলেন গভীর শিল্পের উপাসক এবং তাঁর সেই জ্ঞান তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মাধ্যমে ৩২ ধরনের বাদ্যযন্ত্রের পরিচয় পাওয়া যায়, যা একসময় অবিভক্ত বাংলায় বিস্তৃত ছিল এবং বর্তমানে সারা ভারতবর্ষে তাঁর পরম্পরা সংরক্ষিত হয়েছে। সোমজিৎ দাশগুপ্তের মতে, আধুনিক প্রজন্মের যারা সংগীত চর্চা করছেন, তাদের উচিত তাঁকে স্মরণ রাখা। তিনি তাঁর ধ্রুপদি দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি আধুনিকতাকে ধারণ করেছিলেন। তিনি বলতেন, “আমি একভাবে শিখেছি, এখন তোমাদের একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শেখাচ্ছি।” এই অনন্য শিক্ষা পদ্ধতির কথা উল্লেখ করে সোমজিৎ জানান, পণ্ডিত রবিশঙ্কর একবার তাঁকে বলেছিলেন, “তোমরা তো ওনার ছাত্র। তোমরা যেখানেই বসে গান-বাজনা করো না কেন, কেউ ফেলে দিতে পারবে না।”

পণ্ডিত রাধিকামোহন মৈত্রের জ্ঞানের পরিধি ছিল বিস্ময়কর। সোমজিৎ দাশগুপ্ত বলেন, “তাঁর শিক্ষা, চর্চা, পরম্পরা ও চিন্তাভাবনা গভীর প্রভাব ফেলছে, ভবিষ্যতেও ফেলবে। রাধিকামোহন মৈত্র সব সময় শিক্ষা ও পড়াশোনাকে খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। আমরা রামকৃষ্ণ ঠাকুরের কথা বলতে পারি। রামকৃষ্ণ ঠাকুরের পরম্পরার একটি ধারা রাধিকামোহন মৈত্র ও তাঁর শিষ্যরা। যেমন রামকৃষ্ণ ঠাকুরের শিষ্য ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। বিবেকানন্দের শিষ্য ছিলেন ভগবানচন্দ্র সেন। ভগবানচন্দ্রের শিষ্য হলেন রাধিকামোহন মৈত্র। সেই রামকৃষ্ণ বলেছেন, নরেন (স্বামী বিবেকানন্দ) লোকশিক্ষা দেবে। তার মানে লোকশিক্ষার দরকার আছে। লোকশিক্ষা দিতে হবে। লোকশিক্ষার কাজটি রামকৃষ্ণ মিশন এখনো করছে। এ লোকশিক্ষার বিষয়টিতে রাধিকামোহন মৈত্র খুব জোর দিতেন। পড়াশোনায় খুব জোর দিতেন। নিজেও অসামান্য পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁর পড়াশোনার পরিধি আজও আমার কাছে ধাঁধার মতো মনে হয়। সব ব্যাপারে তাঁর শাস্ত্রীয় পড়াশোনা ছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্র নিয়ে পড়েছিলেন। যাহোক, দর্শনশাস্ত্র নিয়ে তাঁর পড়াশোনা, কিন্তু হিউম্যান ফিজিওলজি নিয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি উত্তর দিতে পারতেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে কোয়ান্টাম ফিজিকস নিয়ে আলোচনা করতেন। কোয়ান্টাম নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন। আবার সংস্কৃত পণ্ডিত গৌরীনাথ শাস্ত্রী বা এ রকম মানুষদের সঙ্গে সংস্কৃতশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করতেন। পাণিনির অষ্টাধ্যায় নিয়ে আলোচনা করতেন। ব্যাকরণ কৌমুদী নিয়েও আলোচনা হচ্ছে, বৈষ্ণবসাহিত্যের অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, রামায়ণ বা মহাভারতের বিভিন্ন পঙ্ক্তি আওড়াচ্ছেন। কী অসাধারণ জ্ঞান, ভাবা যায়! একজন মানুষের এত কিছু রপ্ত করা কীভাবে সম্ভব হয়েছে? অন্যদের কাছে শুনেছি, তাঁর বাবা ব্রজেন্দ্রমোহন মৈত্রও ওই রকম পণ্ডিত ছিলেন। আমরা তাঁকে বুড়ো দাদু বলে ডাকতাম। বুড়ো দাদু বলেছিলেন, সংগীতের বিষয়ে তিনি না-জ্ঞানে, না-চর্চায় রাধু বাবুর পর্যায়ে যেতে পেরেছেন।”

তাঁর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সোমজিৎ দাশগুপ্ত দৃঢ়ভাবে বলেন, “রাধিকামোহন মৈত্র কখনো পুরোনো হবেন না, উবে যাবেন না। তাঁর প্রাসঙ্গিকতা সব সময় থাকবে। ভারতীয় সংস্কৃতি, শাস্ত্রীয় সংগীত, রাগের বিশুদ্ধতা এবং বিপুলসংখ্যক রাগের সংগ্রহ ও প্রসারে তাঁর অবদান রয়েছে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ছাড়াও বিজ্ঞান, দর্শনসহ জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় তাঁর ব্যাপক বিচরণ ছিল। পড়াশোনার গুরুত্ব আমরা তাঁর কাছ থেকে শিখেছি। কে কোনটা নেবে, তা নির্ভর করছে সে কী চর্চা করে, তার পারিবারিক আবহ কী ইত্যাদির ওপর।”

সরোদসাধনার গভীরতা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাধিকামোহন মৈত্র ছিলেন একজন যুগন্ধর শিল্পী। তাঁর সংগীতসাধনার বিশালতা বর্ণনা করার সাহস অনেকেরই নেই। তিনি জানান, “রাধিকামোহন মৈত্রের পরিবারে সংগীত আগে থেকেই ছিল। গত দুই শ সোয়া দুই শ বছরে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বড় শিল্পীরা রাধিকামোহন মৈত্রদের রাজশাহীর জমিদারবাড়িতে গানবাজনা করেছেন। সেই রকম একটা পরিমণ্ডলে বড় বড় কীর্তনের শিল্পী পর্যন্ত সমবেত হতেন, কথকতা হতো, যাত্রাপালা হতো, সমৃদ্ধতম সংগীত সেখানে চর্চা হয়েছিল। কীর্তনাঙ্গের বাউল থেকে অতিসমৃদ্ধ কীর্তন চলেছিল। মৈত্রবাড়ির সংগীতের পরম্পরার প্রায় পাঁচ শ বছর হতে চলেছে। এত বড় পরম্পরার মধ্যে রাধিকামোহন মৈত্র জন্মেছিলেন। তাঁর ঠাকুরদা মৃদঙ্গম, পাখোয়াজ, শ্রীখোল ইত্যাদি বাজাতেন। আর সেই সময় সবাই অল্পবিস্তর গানবাজনা করতে পারতেন। সেই অল্পবিস্তরই আজকের জামানার তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ ও অনেক উচ্চস্তরের ছিল। সেই চর্চা তাঁর পিতামহ ললিতামোহন মৈত্রের মধ্যে ছিল। ললিতামোহন তাঁর বন্ধু ভগবান চন্দ্র সেনের কাছে পাখোয়াজের শিক্ষা নিয়েছেন। ললিতামোহনদের বাড়ির দরবারে যাঁরা গানবাজনা করেছেন ভগবান চন্দ্র সেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ভগবানচন্দ্র সেন ছিলেন তাঁদের ঘরের মানুষ।”

সবশেষে তাঁর গুরুর কথা স্মরণ করে সোমজিৎ দাশগুপ্ত বলেন, “রাধিকামোহন মৈত্রের পেছনে যাঁর অবদান বেশি, তিনি হলেন প্রখ্যাত সরোদবাদক ওস্তাদ আমির খাঁ। তিনি শাহাজানপুরে থাকতেন। সেখান থেকে এসেছিলেন। দ্বারভাঙা রাজদরবার থেকে কলকাতার রাজা নবকৃষ্ণের বাড়িতে এসেছিলেন। সেখান থেকে চলে যান রাজশাহীতে রাধিকামোহন মৈত্রদের জমিদারবাড়িতে। আমির খাঁ রাধিকামোহন মৈত্রকে ৪ বছর বয়স থেকে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষাদান করেছিলেন। তার মধ্যে সরোদ, সুরশৃঙ্গার, বীণা, সুরবাহার—এসব যন্ত্র ছিল। সংগীতের সামগ্রিক একটি শিক্ষা ওস্তাদ আমির খাঁ রাধিকামোহন মৈত্রকে দিয়েছিলেন।”

সাক্ষাৎকারের পরবর্তী কিস্তিগুলো ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হবে।