মাঝ আকাশে উড়োজাহাজের ককপিটে চরম বিশৃঙ্খলা ও সংঘাত। এক ভয়াবহ ছুরিকাঘাতের শিকার হন প্রধান পাইলট। রক্তাক্ত হয়ে লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ ছাড়েননি তিনি। পরবর্তীতে ওই বিমানে থাকা আরও দুজন দক্ষ পাইলট দ্রুত পরিস্থিতি সামলে উড়োজাহাজটি নিয়ন্ত্রণে নেন এবং নিরাপদে অবতরণ করান। এই দুঃসাহসিক ঘটনায় ভারতীয় পাইলট স্মিথ মছারের বীরত্বের কথা দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। এবার সেই উদ্ধারকাজে সহায়তাকারী অন্য দুই পাইলটের পরিচয়ও সামনে এসেছে।

ঘটনাটি ঘটেছিল গত ৩০ সেপ্টেম্বর। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবের দিকে যাচ্ছিল ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী বিমান। ওই বিমানে মোট ১৭৪ জন যাত্রী আরোহী ছিলেন। ঘটনার সময় উড়োজাহাজটি ওমানের আকাশসীমায় অবস্থান করছিল।

অভিযোগ উঠেছে, মাঝ আকাশে থাকা অবস্থায় উড়োজাহাজের একজন পাইলট অন্য পাইলটকে লক্ষ্য করে ছুরিকাঘাত করেন। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলাকারী যাত্রীসহ পুরো উড়োজাহাজটিকে বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। এই আকস্মিক পরিস্থিতির কারণে বিমানটি মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ১৬ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়।

আক্রান্ত পাইলট স্মিথ মছারের অসীম সাহসিকতার কারণেই হামলাকারীকে প্রতিহত করা সম্ভব হয় এবং বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায় উড়োজাহাজটি। এরপর যাত্রীর আসনে থাকা দুজন অভিজ্ঞ পাইলট দ্রুত এগিয়ে এসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় সৌদি আরবের একটি বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটি নিরাপদে অবতরণ করানো হয়।

উদ্ধারকারী ওই দুই পাইলটের একজন হলেন ফিজির নাগরিক হেনসন স্টিভেন এবং অন্যজন দক্ষিণ আফ্রিকার রোয়ান টুথ। গত সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল–নাহিয়ান হেনসন, রোয়ান ও উড়োজাহাজের অন্যান্য ক্রুদের বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁদের প্রদর্শিত অসীম সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা দেওয়া হয়।

টাইমস অব ইসরায়েল তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, সৌদি আরব থেকে ফ্লাইদুবাইয়ের যাত্রীবোঝাই বিমানটি যখন ফেরত আসছিল, তখনও ছুটিতে থাকা হেনসন ও রোয়ান দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা জানা গেছে যে, হেনসন এর আগে ফিজি এয়ারওয়েজে পাইলট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অন্যদিকে, রোয়ান ২০২৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার এয়ারলিংকে কাজ করেছেন।

এই ভয়াবহ ঘটনায় স্মিথ মছার গুরুতর আহত হন। তাঁকেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। হাতে ব্যান্ডেজ এবং মাথার পেছনের দিকে সেলাই করা অবস্থায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলে স্মিথ জানান, পুরোপুরি সুস্থ হতে তাঁর মাস দুয়েক সময় লাগতে পারে।

জানা গেছে, বোয়িং ৭৩৭ মডেলের ওই উড়োজাহাজটি মাঝ আকাশে থাকা অবস্থায় সহ–পাইলট ‘ক্র্যাশ এক্স’ (ককপিটে রাখা কুঠারের মতো সরঞ্জাম) দিয়ে হঠাৎ স্মিথ মছারের ওপর হামলা চালান।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকারি কৌঁসুলিদের মতে, এই ঘটনার পরিকল্পনা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে চালানো সন্ত্রাসী হামলার দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল।

অক্টোবরের শুরুর দিকে আবুধাবির একটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে পাইলট স্মিথ মছার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “প্রথম আঘাত পাওয়ার পর তিনি ভেবেছিলেন, উড়োজাহাজের কাঠামোয় হয়তো বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় ঘটেছে। মুহূর্তের মধ্যে তিনি বুঝতে পারেন, আসলে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়েছে।”

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, “স্মিথ মছার যখন ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন, তখন তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিলেন।”

ককপিটে হামলাকারীকে প্রতিহত করতে এগিয়ে যাওয়া ইয়ানিভ হায়ুন জানান, উড়োজাহাজটি যখন দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করেছিল, তখন তিনি দ্রুত ককপিটের দিকে ছুটে যান।

হায়ুন বলেন, “হামলাকারীকে টেনে বের করে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়। আমি ইয়োক (বিমানের স্টিয়ারিং কন্ট্রোল) টেনে ধরি। উড়োজাহাজটিকে কিছুটা সোজা করা হয়।”

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর আগে জানিয়েছেন, হামলাকারী পাইলট ওমানের নাগরিক এবং তিনি ‘কট্টর ইসলামপন্থী’ মতাদর্শে বিশ্বাসী। তবে তাঁর এই চরম কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য ঠিক কী ছিল, তা এখনও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি।