ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজ ধ্বংস করার দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেছেন। ককপিটের ভেতরে ঘটে যাওয়া সেই চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তগুলো সম্পর্কে তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নতুন কিছু তথ্য প্রকাশ করেছেন বলে দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের মুম্বাইয়ের বাসিন্দা পাইলট স্মিথ মছার দাবি করেছেন, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইসরায়েলগামী ওই উড়োজাহাজটিতে প্রথম দিকে তিনি কোনো যান্ত্রিক সমস্যা বা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেছিলেন।

গতকাল রোববার এক ভিডিও কলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলার সময় ভারতীয় পাইলট মছার বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম উড়োজাহাজের কোনো সমস্যা হয়েছে। কিন্তু এরপর একের পর এক আঘাত আসতে শুরু করে। তখনই আমি বুঝতে পারি, সমস্যা উড়োজাহাজে নয়, সমস্যা ককপিটে আমার সঙ্গে থাকা অন্য লোকটিকে নিয়ে।’

বর্তমানে এই ভারতীয় পাইলট আবুধাবির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ইসরায়েল ও সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত কো-পাইলট বা সহ-পাইলটের নাম হাম্মাম আল-হাম্মামি (২৯), যিনি ওমানের নাগরিক।

ক্যাপ্টেন মছার জানান, তিনি শুরুতে সহ-পাইলটকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে মাথার পেছনে প্রচণ্ড আঘাত পাওয়ার ফলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। ভারতীয় এই পাইলট আরও দাবি করেন, ‘আমি তাঁকে থামানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তাঁর প্রাথমিক আঘাতগুলোর কারণে আমার দৃষ্টিশক্তি বলতে গেলে প্রায় শূন্য হয়ে গিয়েছিল। আমি চোখের সামনে সবকিছু একদম ঝাপসা দেখছিলাম।’

মছার আরও যোগ করেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি উপলব্ধি করেন যে উড়োজাহাজটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে পাইলট মছার বলেন, ‘আমার স্মৃতিশক্তি তখনো ঠিক ছিল। তবে এখন তা ছোট ছোট খণ্ডচিত্রের মতো মনে আসছে। কিন্তু সেই সময়ের ঘটনাগুলোর মধ্যে আমার এটুকু মনে আছে।’

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইসরায়েল যাওয়ার পথে সৌদি আরবের আকাশসীমা অতিক্রম করার সময় এই ঘটনাটি ঘটে। সে সময় ১৭২ জন আরোহী নিয়ে ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটটি মাত্র ৩০ সেকেন্ডের কম সময়ে ১৪ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে যায়।

ভারতীয় পাইলট জানান, ককপিটের দরজা বাইরে থেকে কেবল নির্দিষ্ট কোড ব্যবহার করে খোলা সম্ভব, তবে ভেতর থেকে তা খুব সহজেই খোলা যায়। মছার বলেন, ‘বাইরে থেকে এটি কেবল একটি কোড দিয়ে খোলা যেত। বাইরে থাকা আমার সহকর্মীরা কোড দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি তাদের কোড ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছিল না।’

স্মিথ মছার আরও জানান, ‘ভেতর থেকে একটি ছোট ও দ্রুত মোড় দেওয়ার বিষয় ছিল। দরজার নবে হাত পৌঁছানোর পর আমি তা মোড় দিয়ে খুলে ফেলি।’ তবে ওমানি সহ-পাইলট দ্রুত সেটি পুনরায় বন্ধ করে দেন। ককপিটের মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় মছার অনুভব করেন যে তাঁর ভেতরে ‘শেষ একটা লড়াই’ বাকি আছে।

প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কাছে ক্যাপ্টেন মছার দাবি করেন, ‘আর তখনই আমি আমার সব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করি। আমার যা কিছু শক্তি ছিল, তা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দরজার কাছে গিয়ে সেটি খুলে দিই।’

মছার দরজা খুলে দেওয়ার পরপরই যাত্রীরা ভেতরে প্রবেশ করেন এবং হামলাকারীকে কাবু করতে সক্ষম হন। ভারতীয় পাইলট বলেন, ‘ভাগ্যক্রমে, মানুষ বাইরে প্রস্তুত ছিল। তারা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়, আর বাকিটা তো আপনার জানা।’

হামলাকারীকে কাবু করা যাত্রীদের একজন ইয়ানিভ হায়ুন জানান, উড়োজাহাজটি যখন খাড়াভাবে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিল, তখন তিনি দ্রুত ককপিটের দিকে দৌড়ে যান এবং ‘উড়োজাহাজটিকে কিছুটা সোজা করেন।’

এর আগে গত শুক্রবার সৌদি আরবের একটি হাসপাতাল থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলেন পাইলট মছার। সে সময় তাঁর মাথায় ব্যান্ডেজ এবং নাকে টিউব লাগানো ছিল। হাসপাতাল থেকে মছার বলেছিলেন, ‘আমার অনেক ক্ষত হয়েছিল। আমি নিচে পড়ে গিয়েছিলাম।’

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ২০২৭ সালের মে মাসে ইসরায়েলের স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপনে ক্যাপ্টেন মছার ও প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমাদের দারুণ বন্ধু ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার এবং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আমি সেখানে পেতে চাই। তাঁরা উৎসবে মশাল বহনের সম্মান অর্জন করুক, তা আমি সত্যি মন থেকে চাই।’

অন্যদিকে, আল-হাম্মামির এই হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তা নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র গতকাল জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ওমানি সহ-পাইলট ২০২৩ সালে বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটি থেকে ‘অ্যাভিয়েশন ম্যানেজমেন্টে দূরশিক্ষণ কোর্স সম্পন্ন’ করেছিলেন। এছাড়া অস্ট্রেলীয় সংস্থাও আল-হাম্মামির বিষয়ে তদন্ত করছে, কারণ তিনি শিক্ষার্থী হিসেবে ওই দেশে প্রায় দুই বছর অবস্থান করেছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে।