ওয়ানডে ক্রিকেটে দীর্ঘ পথচলা থাকলেও দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলার অভিজ্ঞতা ছিল নামিবিয়ার প্রায় শূন্য। গত সেপ্টেম্বরেই প্রথমবারের মতো এমন একটি সিরিজে অংশ নিয়েছিল তারা, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হোয়াইটওয়াশ হতে হয় তাদের। তবে দ্বিতীয় প্রচেষ্টাতেই ইতিহাস লিখে ফেলল আফ্রিকার এই দেশটি। আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশ আয়ারল্যান্ডকে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ৩-২ ব্যবধানে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো দ্বিপক্ষীয় সিরিজ জয়ের স্বাদ পেয়েছে নামিবিয়া।
রোববার (১ নভেম্বর) নামিবিয়ার রাজধানী উইন্ডহুকে সিরিজের পঞ্চম ও শেষ ওয়ানডে ম্যাচে মুখোমুখি হয় দুই দল। সিরিজের ফলাফল ২-২ সমতায় থাকায় শেষ ম্যাচটি কার্যত একটি অলিখিত ফাইনালে পরিণত হয়েছিল। তবে শিরোপা নির্ধারণী এই লড়াইয়ে আয়ারল্যান্ড খুব বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে ৩৩ দশমিক ১ ওভারে মাত্র ১২৯ রানেই অলআউট হয়ে যায় সফরকারী দল। জবাবে মাত্র ২১ দশমিক ২ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ১৩১ রান তুলে নিয়ে জয় নিশ্চিত করে নামিবিয়া।
টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আয়ারল্যান্ড। কিন্তু শুরু থেকেই নামিবিয়ার বোলারদের সামনে তারা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে আইরিশরা এবং মাঝের ওভারগুলোতে তাদের ব্যাটিং লাইনে বড় ধরনের ধস নামে।
আয়ারল্যান্ডের এই ব্যাটিং বিপর্যয়ের প্রধান কারিগর ছিলেন অভিজ্ঞ বাঁহাতি পেসার জেজে স্মিট। তিনি ৯ ওভারে তিনটি মেডেনসহ মাত্র ২০ রান দিয়ে ৪টি উইকেট শিকার করেন। বিশেষ করে অধিনায়ক লরকান টাকার, কার্টিস ক্যাম্ফার ও জর্জ ডকরেলকে মাত্র চার বলের ব্যবধানে প্যাভিলিয়নে ফিরিয়ে প্রতিপক্ষের মিডল অর্ডার তছনছ করে দেন এই পেসার।
স্মিটের করা ২২তম ওভারে মাত্র চার বলের ব্যবধানে কোনো রান যোগ না করেই তিনটি উইকেট হারায় আয়ারল্যান্ড। ফলে ৮৪ রানে ৩ উইকেট থেকে মুহূর্তের মধ্যেই তাদের স্কোর হয়ে যায় ৮৪ রানে ৬ উইকেট। এই ধাক্কা সামলে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি সফরকারীরা।
স্মিটকে দারুণ সহায়তা করেন ২১ বছর বয়সী জ্যাক ব্র্যাসেল, যিনি মাত্র ১৫ রানে ৩ উইকেট নেন। আইরিশ ব্যাটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৩ রান করেন জর্ডান নিল। এছাড়া কেইড কারমাইকেল ২৭, হ্যারি টেক্টর ২১ এবং অধিনায়ক টাকার ২০ রান করেন।
মাত্র ১৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং শুরু করে নামিবিয়া। ওপেনার লরেন স্টিনক্যাম্প ৪৪ বলে ছয়টি চার ও একটি ছক্কায় ৪৬ রান করে জয়ের মজবুত ভিত্তি তৈরি করেন। অধিনায়ক গেরহার্ড ইরাসমাসও দ্রুত রান তোলার কৌশলে মনোযোগ দেন এবং মাত্র ১৮ বলে তিনটি চার ও একটি ছক্কায় ৩০ রান করেন।
মাঝপথে কয়েকটি উইকেট হারালেও নামিবিয়ার জয় নিয়ে খুব একটা সংশয় তৈরি হয়নি। শেষ পর্যন্ত জেন গ্রিনের অপরাজিত ১১ ও উইলেম মাইবার্গের অপরাজিত ৩ রানে জয় নিশ্চিত করে স্বাগতিকরা। তখনো ইনিংসের ১৭২ বল বাকি ছিল।
এই জয়ের মাধ্যমে শুধু সিরিজই জেতেনি নামিবিয়া, বরং নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে। ২০০৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে আন্তর্জাতিক এই সংস্করণে অভিষেক হয়েছিল দেশটির। তবে সেই আসরের পর দীর্ঘ সময় তারা নিয়মিত ওয়ানডে খেলার সুযোগ পায়নি।
২০১৯ সালে পুনরায় ওয়ানডে মর্যাদা পাওয়ার পর আইসিসির বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিয়মিত খেলতে শুরু করে নামিবিয়া। তবে দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজে তাদের প্রথম অংশগ্রহণ হয় গত সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। তিন ম্যাচের সেই সিরিজে তারা প্রতিটি ম্যাচেই পরাজিত হয়েছিল।
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এবারের সিরিজের শুরুটাও হয়েছিল পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। প্রথম ওয়ানডেতে সফরকারীরা ৫৫ রানে জয়লাভ করে। তবে দ্বিতীয় ম্যাচেই ঘুরে দাঁড়ায় নামিবিয়া। অধিনায়ক ইরাসমাসের ১২৫ বলে অপরাজিত ১৫৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংসের ওপর ভর করে ৩২১ রান তোলে দলটি এবং ৩১ রানের জয় পায়।
ওয়ানডেতে আইসিসির পূর্ণ সদস্য কোনো দেশের বিপক্ষে এটিই ছিল নামিবিয়ার প্রথম জয়। সেই আত্মবিশ্বাস পুঁজি করে তৃতীয় ম্যাচেও দুর্দান্ত খেলে স্বাগতিকরা। ইয়ান ফ্রাইলিঙ্কের ১২২ বলে ১২৬ রানের ইনিংসে ৩১৬ রান তোলে নামিবিয়া। এরপর আয়ারল্যান্ডকে ২৫৩ রানে আটকে দিয়ে ৬৩ রানের জয় তুলে নেয় তারা।
টানা দুই জয়ে সিরিজে এগিয়ে গেলেও চতুর্থ ওয়ানডেতে বড় ধাক্কা খায় নামিবিয়া। ১৩০ রানে জিতে সিরিজে সমতা ফেরায় আয়ারল্যান্ড। ফলে শেষ ম্যাচেই নির্ধারিত হয় শিরোপার ভাগ্য, যেখানে আর ভুল করেনি স্বাগতিকরা।
পুরো সিরিজে ব্যাট ও বল হাতে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন অধিনায়ক ইরাসমাস। পাঁচ ম্যাচে ২৬৩ রান করার পাশাপাশি ৪টি উইকেটও নিয়েছেন তিনি। আর শেষ ওয়ানডেতে দুর্দান্ত বোলিংয়ের জন্য ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছেন স্মিট।