টানা দুটি ম্যাচে জয়ের খরা কাটিয়ে আবারও সাফল্যের দেখা পেল ইন্টার মায়ামি। নিউ ইংল্যান্ড রেভল্যুশনের বিপক্ষে মাঠে লড়াই করতে নেমে এক পর্যায়ে পিছিয়ে পড়ে হারের মুখে দাঁড়িয়ে ছিল দলটি। তবে লিওনেল মেসি যখন মাঠে থাকেন, তখন ম্যাচের ভাগ্য বদলাতে খুব বেশি সময় লাগে না।
প্রথমে এক অসাধারণ অ্যাসিস্টের মাধ্যমে দলকে সমতায় ফিরিয়ে আনেন তিনি। পরবর্তীতে তিন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে নিজেই করেন জয়সূচক গোল। আর্জেন্টাইন এই মহাতারকার অসাধারণ নৈপুণ্যের কল্যাণে নিউ ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে ইস্টার্ন কনফারেন্সের দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে মায়ামি। এই জয়ের মাধ্যমে আগামী বছরের কনকাকাফ চ্যাম্পিয়নস কাপে খেলার যোগ্যতা নিশ্চিত করল তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রোববার (১ নভেম্বর) রাতে ম্যাসাচুসেটসের ফক্সবোরোতে অবস্থিত জিলেট স্টেডিয়ামে মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) নিয়মিত মৌসুমের এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়। প্লে-অফের আগে কনফারেন্সের দ্বিতীয় স্থানটি দখলের লড়াইয়ে এই ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত ৫৪ হাজার ১১২ দর্শকের সামনে স্বাগতিকদের হতাশ করে তিন পয়েন্ট ছিনিয়ে নেয় মেসির দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলে। নিজেদের মাঠে বলের দখলে এগিয়ে থাকা নিউ ইংল্যান্ড বেশ কয়েকবার আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও মায়ামির রক্ষণভাগ ভাঙতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, লিওনেল মেসি এবং জার্মান বেরতেরামেকে সামনে রেখে আক্রমণ সাজানোর চেষ্টা করে সফরকারী মায়ামি।
প্রথমার্ধের ২৮তম মিনিটে মায়ামির বেরতেরামে একটি দারুণ সুযোগ পান। তবে বক্সের বাঁ দিক থেকে তার নেওয়া শটটি রুখে দেন নিউ ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক ম্যাট টার্নার। এরপর দুই দলই চেষ্টা চালালেও কোনো পক্ষই গোলের দেখা পায়নি। ফলে গোলশূন্য অবস্থায় প্রথমার্ধ শেষ হয়।
বিরতির পর থেকেই আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয় নিউ ইংল্যান্ড এবং দ্রুতই তার ফল পায় তারা। ম্যাচের ৫৩তম মিনিটে ইলাই ফেইনগোল্ড ও পেইটন মিলারের সমন্বিত আক্রমণ থেকে গোল করেন দানিয়েল গাজদাগ। বক্সের ভেতর থেকে ডান পায়ের নিখুঁত শটে মায়ামির গোলরক্ষক ডেইন সেন্ট ক্লেয়ারকে পরাস্ত করেন এই মিডফিল্ডার।
এক গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে মায়ামি। আক্রমণে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন মেসি। এক ঘণ্টা পার হওয়ার পর আর্জেন্টাইন তারকার একটি প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন টার্নার। ফিরতি বলে বেরতেরামের শটটি গোললাইন থেকে রুখে দেন নিউ ইংল্যান্ডের ব্রুকলিন রেইন্স।
অবশেষে ৬৯তম মিনিটে মেসির এক অসাধারণ অ্যাসিস্টে সমতায় ফেরে মায়ামি। তেলাসকো সেগোভিয়ার উঁচু করে বাড়ানো বল বক্সের ভেতর পেয়ে পেছনের দিকে মাথা দিয়ে বাড়িয়ে দেন আর্জেন্টাইন তারকা। বলের দিকে না তাকিয়েই দেওয়া সেই পাস থেকে শক্তিশালী হেডে জাল খুঁজে নেন বেরতেরামে।
চলতি এমএলএস মৌসুমে এটি ছিল বেরতেরামের দশম গোল। অন্যদিকে, মেসির অ্যাসিস্টের সংখ্যা পৌঁছেছে ১৬-তে। আগের দুটি ম্যাচে গোল কিংবা অ্যাসিস্ট করতে না পারার পর আবারও দলের আক্রমণে সরাসরি অবদান রাখেন ৩৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
সমতায় ফেরার পর জয়ের জন্য চাপ বাড়াতে থাকে মায়ামি। তবে কাঙ্ক্ষিত গোলের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ৮৩তম মিনিট পর্যন্ত। এবার আর সতীর্থের ওপর নির্ভর না করে নিজেই গোল করে দলকে এগিয়ে দেন মেসি।
বদলি হিসেবে নামা লুইস সুয়ারেজের পাস পেয়ে বক্সের বাইরে বলের নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি। এরপর একে একে তিন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে সেগোভিয়ার সঙ্গে বল আদান-প্রদান করে ঢুকে পড়েন বক্সে। শেষ পর্যন্ত বাঁ পায়ের নিচু শটে বল পাঠিয়ে দেন গোলপোস্টের ডান দিকের নিচের কোণে। গোলরক্ষক টার্নারের পক্ষে সেই বল ঠেকানো অসম্ভব ছিল।
মেসির এই দুর্দান্ত গোলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় মায়ামি। তবে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়। ৮৭তম মিনিটে নিউ ইংল্যান্ডের লুকা লাঙ্গোনির ক্রস ঠেকাতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল পাঠিয়ে দেন মায়ামির ডিফেন্ডার ইয়ান ফ্রে। সমতায় ফেরার আনন্দে মেতে ওঠে স্বাগতিকরা।
কিন্তু ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) পর্যালোচনায় দেখা যায় লাঙ্গোনি অফসাইড অবস্থানে ছিলেন, ফলে গোলটি বাতিল করা হয়। এভাবে শেষ মুহূর্তে বড় বিপদ থেকে রক্ষা পায় মায়ামি। বাকি সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় ২-১ ব্যবধানের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে সফরকারীরা।
এই জয়ে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান আরও সমৃদ্ধ করেছেন মেসি। চলতি এমএলএস মৌসুমে ২৬ গোল নিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ১৬ অ্যাসিস্টসহ মোট ৪২টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন। গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৯টি বেশি অবদান রয়েছে তাঁর।
নিউ ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও দুর্দান্ত রেকর্ড ধরে রেখেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। এই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ছয় ম্যাচে আট গোল ও ছয় অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। এর মধ্যে পাঁচ ম্যাচেই একাধিক গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি।
ম্যাচ শেষে মেসির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মায়ামির কোচ ক্রিস্তিয়ান ‘কিলি’ গনসালেস। চলতি মৌসুমে এমএলএসের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারের যোগ্য দাবিদার হিসেবে মেসিকেই এগিয়ে রাখছেন তিনি। তার মতে, মেসির সঙ্গে অন্য কারও তুলনা হয় না। বয়স ও দলের জন্য অবদান বিবেচনায় এই স্বীকৃতি তার প্রাপ্য।
এই জয়ে ৩৩ ম্যাচে ৫৯ পয়েন্ট নিয়ে ইস্টার্ন কনফারেন্সের দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে ইন্টার মায়ামি। সমান ম্যাচে ৫৮ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে নিউ ইংল্যান্ড। একই সঙ্গে স্বাগতিকদের টানা চার ম্যাচের জয়ের ধারাও থামিয়েছে মেসির দল।
এটি চলতি মৌসুমে মায়ামির দশম অ্যাওয়ে জয়। লিগে অন্য যেকোনো দলের চেয়ে অন্তত তিনটি বেশি ম্যাচ প্রতিপক্ষের মাঠে জিতেছে তারা। গুরুত্বপূর্ণ এই জয়ে ২০২৭ সালের কনকাকাফ চ্যাম্পিয়নস কাপেও জায়গা নিশ্চিত হয়েছে ক্লাবটির।
নিয়মিত মৌসুমে মায়ামির সামনে এখন বাকি মাত্র একটি ম্যাচ। আগামী শনিবার (৭ নভেম্বর) নিজেদের মাঠে শার্লট এফসির মুখোমুখি হবে তারা। সেই ম্যাচ জিতলেই অন্য দলের ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে ইস্টার্ন কনফারেন্সের দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করতে পারবে মেসির দল।