এইচএসসি পরীক্ষায় এবার নাটোরে ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এই চরম অকৃতকার্যতার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছে জেলা শিক্ষা অফিস। নোটিশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই ব্যর্থতার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা শিক্ষা অফিসের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর জেলার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়। এই বছরের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৮টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, যার মধ্যে দুটি এমপিওভুক্ত এবং বাকি ১৬টি নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি শিক্ষা বিভাগের নজরে আসার পর এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, পাঠদান প্রক্রিয়া, শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি, নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রোস্তম আলী হেলালী বলেন, “জেলার ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল শূন্য হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কেন এমন ফলাফল হয়েছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদনসহ তাদের সশরীরে কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতেও বলা হয়েছে। ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, এমন ফলাফল সামনে আসায় হতবাক হয়ে গেছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা। তাদের অনেকের মতে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় চরম অমনোযোগিতা, ক্লাসে নিয়মিত অনুপস্থিতি, পরীক্ষার প্রস্তুতির অভাব এবং বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে এমন ফলাফল হতে পারে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের শিক্ষার্থীদের খাতা পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং কেউ কেউ ডিসেম্বরের বিশেষ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে বাগাতিপাড়া উপজেলার পৌর মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ, তমালতলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ ও টিপুরিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড টেকনিক্যাল কলেজ; গুরুদাসপুর উপজেলার নূর মোহাম্মদ বিশ্বাস টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড বিজনেস কলেজ, চাঁচকৈড় নাজিম উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দুর্গাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং বঙ্গবন্ধু টেকনিক্যাল বিজ্ঞান ও তথ্য এবং বিজনেস ইনস্টিটিউট; লালপুর উপজেলার মাকড়াম উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, রাধাকান্তপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ, নেংগোপাড়া আলিম মাদ্রাসা ও রামপুর জামিরিয়া আলিম মাদ্রসা; সিংড়া উপজেলার আগাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ; নলডাঙ্গা উপজেলার সরকুতিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ছাতারভাগ স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
এছাড়া এমপিওভুক্ত দুটি প্রতিষ্ঠান হলো গুরুদাসপুর উপজেলার চলনবিল টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কর্মাস কলেজ এবং নলডাঙ্গা উপজেলার শাখারিপাড়া ফাজিল মাদ্রাসা।
নলডাঙ্গা উপজেলার শাখারীপাড়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এবার তার প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস না করায় প্রতিষ্ঠানের সবাই বিস্মিত হয়েছেন। তার মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীরা প্রতি বছরই ভালো ফলাফল করে। এবার কীভাবে বা কেন এমন হলো, তা তারাও বুঝতে পারছেন না। দ্রুত পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করবেন তিনি।”
গুরুদাসপুর উপজেলার চলনবিল টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড বিএম কলেজের অধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমান বলেন, “শিক্ষার্থীদের ২৩ জনই বাংলা ও ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছেন। বোর্ড চ্যালেঞ্জ করা হবে। পাশাপাশি সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিসেম্বরে অকৃতকার্যদের যে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাতে অংশগ্রহণ করবেন এবং সবাই কৃতকার্য হবেন বলে আশা করেন তিনি।”
এই পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষাবিদ সুবিধ কুমার মৈত্র অলোক বলেন, “একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস না করা উদ্বেগজনক। এর পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের ভূমিকা, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও থাকতে পারে। তাই শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ না করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”
নাটোরের জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার জানিয়েছেন, শতভাগ অকৃতকার্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর নিতে তিনি শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রকৃত কারণ উদঘাটনের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য যে, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে নাটোরে উচ্চমাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে মোট ১৪২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছিল, যার মধ্যে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।