মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কের তালতলা এলাকা থেকে একটি পথ সোজা চলে গেছে মনু নদ প্রকল্পের বাঁধের রাঙাউটি হয়ে শমসেরনগর সড়কে। দুই পাশে বিস্তৃত ধানখেত আর মাঝখানে একটি সরু সড়ক। সেই সড়কের এক পাশে এখন সারি ধরে ফুটেছে লাল ও হলুদ রঙের রাধাচূড়া। রাঙাউটি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার পথ এখন ফুলে ফুলে সেজেছে, যা পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

মনু নদ প্রকল্পের বড় বাঁধ থেকে পানির একটি নালা তালতলায় এসে মিশেছে। একসময় এখানে তালগাছ ছিল বলে এলাকাটির নাম হয়েছে তালতলা। শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত এই নালার পূর্ব পাড়টি বর্তমানে একটি সংযোগ সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মাতারকাপনে মনু ব্যারাজ হয়ে এই সড়কটি মৌলভীবাজার-কুলাউড়া এবং মৌলভীবাজার-শমসেরনগর—জেলার এই দুটি প্রধান সড়ককে সংযুক্ত করেছে। ফলে এখন আর প্রয়োজন না হলে এক সড়ক থেকে অন্য সড়কে যাওয়ার জন্য মৌলভীবাজার শহর ঘুরে যেতে হয় না।

গত শুক্রবার সকালে সদর উপজেলার তালতলায় গেলে দেখা যায়, সড়কের পশ্চিম পাশে সারি সারি ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। কোথাও থোকা থোকা হলুদ ফুল বাতাসে দুলছে, আবার কোথাও লাল ফুলের সমারোহ। কিছু গাছে ফলও এসেছে। লম্বা শিমের মতো দেখতে কাঁচা ফলগুলো সবুজ, আর পাকা ফলগুলোতে খয়েরি রং ধরেছে। মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কের তালতলা থেকে দক্ষিণ দিকে তাকালেই এই নজরকাড়া রঙের ফুলগুলো চোখে পড়ে। যাঁরা কিছুটা সময় নিয়ে এই পথে হাঁটেন, তাঁরা ফুলের চারপাশে ভ্রমরের ওড়াউড়ি এবং গুঞ্জনও শুনতে পান।

লোকমুখে প্রচলিত যে, টকটকে লাল কৃষ্ণচূড়াকে তুলনা করা হয় শ্রীকৃষ্ণের ময়ূরের পালকশোভিত চূড়া বা মুকুটের সঙ্গে। সেই ধারায় হলুদ, লালচে কমলা ও সোনালি রঙের ফুলটি হয়ে ওঠে রাধার অলংকৃত মুকুট বা অলংকার—রাধাচূড়া।

সড়কের পূর্ব পাশে এখনো ঘন সবুজের আধিপত্য। সেখানে পলাশ, শিমুল ও সোনালুসহ আরও কিছু গাছ বড় হচ্ছে। ফুল ফোটার সময় হলে এগুলোও ডালপালা ফুলে ভরে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাধাচূড়ার ছোট ছোট নতুন গাছেও এখন কুঁড়ি আসছে। জানা গেছে, সড়কের পাশে রাঙাউটি রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ এই গাছগুলো লাগিয়েছে। রাস্তার দুই পাশের ধানখেত এখনো সবুজ থাকলেও ধান পাকতে শুরু করেছে, ফলে কোথাও কোথাও সোনালি রঙের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে।

রাধাচূড়া মূলত ক্রান্তীয় অঞ্চলের ফুল। দেখতে অনেকটা কৃষ্ণচূড়ার মতো হলেও গাছ আকারে ছোট এবং ফুলের রঙে ভিন্নতা থাকে। নামের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা না গেলেও লোকমুখে প্রচলিত যে, শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার প্রেমকাহিনির সঙ্গে মিলিয়ে এই নাম দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, “টকটকে লাল কৃষ্ণচূড়াকে তুলনা করা হয় শ্রীকৃষ্ণের ময়ূরের পালকশোভিত চূড়া বা মুকুটের সঙ্গে। সেই ধারায় হলুদ, লালচে কমলা ও সোনালি রঙের ফুলটি হয়ে ওঠে রাধার অলংকৃত মুকুট বা অলংকার—রাধাচূড়া।”

রাধাচূড়ার ফুল ডালের আগায় লম্বা ডাঁটায় থোকা বেঁধে ফোটে। এই ফুলের কোনো সৌরভ নেই, তবে এর রূপ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর আদি নিবাস মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ইউরোপীয় নাবিকদের মাধ্যমে এর বীজ এশিয়ায় আসে এবং পরবর্তীতে তা ভারত উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

নাম বা ইতিহাস যাই হোক না কেন, তালতলা থেকে রাঙাউটি পর্যন্ত এই ছোট সড়কটি এখন রাধাচূড়ারই পথ। সবুজ পাতার ঝোপ ছাড়িয়ে লাল ও হলুদ ফুল পুরো সড়কটিকে রঙিন করে তুলেছে। এই পথ দিয়ে যাঁরা যাতায়াত করেন, তাঁদের একবার অন্তত এই ফুলের সৌন্দর্যের দিকে তাকাতেই হয়।