ধীরে ধীরে নেমে আসছে সন্ধ্যা। চারপাশের পরিবেশ এখন শান্ত ও নীরব। এমন সময়ে পথ চলতে চলতে হঠাৎ নাকে এসে লাগে এক তীব্র মিষ্টি ও ঝাঁজালো ঘ্রাণ, যা মুহূর্তেই থমকে দেয় পথচারীকে। রাতের গভীরতা যত বাড়ে, এই সুবাস তত বেশি তীব্র এবং মাদকতাময় হয়ে ওঠে। হেমন্তের এই বিশেষ সময়ে ছাতিমগাছের ডালে ডালে এখন সবুজাভ-সাদা ফুলের এক বিশাল প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে।

দৃশ্যত এই ফুলটি খুব একটা নজরকাড়া নয়। তবে যখন একসঙ্গে অনেক ফুল ফুটে থাকে, তখন তা বেশ মনোরম দেখায়। হেমন্ত ঋতুতে গাছের এমন ফুলের প্রাচুর্য সাধারণত অন্য কোনো গাছে খুব একটা দেখা যায় না। মৃদু হাওয়ায় যখন ফুল ও পাতাগুলো দুলতে থাকে, তখন শিশিরভেজা ঘাসের ওপর ঝরে পড়ে এই সাদাটে ফুলগুলো।

গত বুধবার এক স্কুলশিক্ষিকা জানান, গ্রামের বাড়ি থেকে সন্ধ্যার পর শহরে ফেরার পথে তিনি ‘ছাতনি’ (ছাতিমের স্থানীয় নাম) ফুলের তীব্র গন্ধ পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কের অন্তত দুটি স্থানে তিনি ছাতিম ফুল ফুটতে দেখেছেন।

পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে ওই সড়কের চাঁদনীঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে পাশাপাশি দুটি ছাতিমগাছ দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের বাতাসে তখন ফুলের সুবাস। এর মধ্যে একটি গাছ তুলনামূলকভাবে কম বয়সী হলেও তাতে প্রচুর ফুল ফুটেছে। আগের রাতের বৃষ্টিতে ভেজা ফুলগুলোকে আরও স্নিগ্ধ মনে হচ্ছিল। অন্য গাছটি বেশ বয়স্ক। ছাতার মতো থরে থরে সাজানো শাখা-প্রশাখায় অসংখ্য ফুল ফুটেছে। গাছটির নিচে টিনের চালে জমে আছে ঝরে পড়া ফুলের স্তূপ।

শিল্প ও সাহিত্যের জগতেও হেমন্ত এবং ছাতিম ফুলের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে ধনঝরি পাহাড়ে হেমন্তের শুরুতে ছাতিম ফোটার সুবাসের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘কিছুদূর উঠতেই কিসের মধুর সুবাসে মনপ্রাণ মাতিয়া উঠিল। গন্ধটা অত্যন্ত পরিচিত...চারিদিকে চাহিয়া দেখি ধনঝরি পাহাড়ে যে এত ছাতিম গাছ আছে তাহা পূর্বে লক্ষ্য করি নাই। এখন প্রথম হেমন্তে ছাতিম গাছে ফুল ধরিয়াছে, তাহারই সুবাস।’

অন্যদিকে, নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা তাঁর ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইয়ে লিখেছেন, ছাতিমই বোধ হয় একমাত্র বৃক্ষ যে হেমন্তের অঙ্গনে দাঁড়িয়ে প্রস্ফুটন আর সুগন্ধের প্লাবনে এই দুরন্ত শীতকে অভ্যর্থনা জানায়। প্রস্ফুটনের এমন অবারিত উচ্ছ্বাস এবং দূরবাহী প্রবল উগ্র গন্ধের ঐশ্বর্য আর কোনো হৈমন্তী তরুরই নেই।

সংস্কৃত ভাষায় ছাতিমের নাম হলো সপ্তপর্ণী। এই গাছটি চিরহরিৎ এবং এর আকৃতির পাশাপাশি ঘন ছায়ার জন্যও বেশ সমাদৃত। এর ডালপালা ছড়ানোর ভঙ্গিটি অনেকটা কয়েকটি জোড়া দেওয়া ছাতার মতো। ফুলগুলো অনুজ্জ্বল এবং সবুজাভ-সাদা রঙের। ফলগুলো সরু ও লম্বাটে, আর বীজগুলো রোমশ যা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এই বীজ থেকেই খুব সহজেই চারা জন্মায় এবং দ্রুত বৃদ্ধি পায়। যদিও এর কাঠ খুব উন্নত মানের নয়, তবে সাধারণ আসবাবপত্র তৈরিতে এটি ব্যবহার করা যায়। এছাড়া গাছের ছাল ও আঠা ভেষজ গুণসম্পন্ন। ছাতিম ফুলের নিচের অংশটি নলাকৃতির এবং এর পাঁচটি পাপড়ি বাঁকানো থাকে। ফুলের মতোই অজস্র সংখ্যায় সরু লম্বা ফল সারা গাছে ছড়িয়ে থাকে।

একটা সময় পথেঘাটে বা বাড়ির আঙিনায় প্রচুর ছাতিম গাছ চোখে পড়ত। তবে নানা কারণে বর্তমানে এই গাছ আগের মতো আর দেখা যায় না। তা সত্ত্বেও, হাওয়ায় ভেসে আসা বীজ থেকে যে কটি গাছ প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠেছে, তাদের তীব্র ফুলের সুগন্ধই এখন নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।