মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বীরগাঁও গ্রামের সড়ক থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন চালতাগাছ। দূর থেকে দেখলে গাছটি ঠিক কী ধরনের তা বোঝা কঠিন হলেও, কাছে গেলেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি একটি চালতাগাছ।

গত বুধবার দুপুরে বীরগাঁওয়ের একটি মসজিদের পাশে এই গাছটির দেখা মেলে। গাছের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায়, খাঁজকাটা সবুজ পাতার আড়ালে থোকা থোকা ফল ঝুলছে; তবে ফুলগুলো আগেই ঝরে গেছে। স্থানীয়দের কেউ গাছটির সঠিক বয়স নিশ্চিত করে বলতে পারেননি, তবে বাহ্যিক অবয়ব দেখে মনে হয় এটি বেশ পুরনো একটি গাছ।

প্রতি বছর নিয়ম অনুযায়ী এই গাছে ফুল ফোটে। তবে খুব কম মানুষই সেই ফুলের দিকে নজর দেন। আপন খেয়ালে ফুলগুলো ফোটে এবং দ্রুতই পাপড়ি ঝরে যায়। তবে চাটনি ও টক তরকারির উপাদ হিসেবে চালতার ব্যাপক চাহিদা থাকায় অনেকেই গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করেন। এবারও তেমনটিই ঘটেছে; হাতের নাগালে এখন আর কোনো ফল অবশিষ্ট নেই। তা সত্ত্বেও গাছের উপরের অংশে ফলের পরিমাণ কম নয়। ছড়িয়ে থাকা ডালপালায় পাতার আড়ালে প্রচুর চালতা ঝুলছে যা এখন শিশিরে ভেজা।

দূর থেকে গাছটিকে অনেকটা ব্যাঙের ছাতার মতো মনে হয়, যা নিচ থেকে গোল হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। কাছে গেলে এর প্রকৃত রূপটি ফুটে ওঠে। বর্তমানে ফুল না থাকলেও এর পাতাগুলো চকচকে সবুজ এবং লাবণ্যময়।

নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা তাঁর ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইয়ে লিখেছেন, “দেশের অতি পরিচিত চালতার আকর্ষণ ফুলে নয়—ফলে। উপযোগবাদী দৃষ্টিতে ফুলের শোভা হারিয়ে গেছে। অথচ চালতা ফুল যেকোনো সুন্দর ফুলের সঙ্গেই তুলনীয়। গঠনে এটি ম্যাগনোলিয়ার ঘনিষ্ঠ। হয়তো এ কারণেই চালতা ফুল দেখে হঠাৎ কেউ চমকে ওঠেন, বিস্মিত হন। কেন এত দিন এই ফুলের দেখা পাননি—এ নিয়ে কারও কারও মনে হয়তো প্রশ্নও তৈরি হয়।”

চালতা গাছটির ইংরেজি নাম ‘এলিফেন্ট অ্যাপল’। সাধারণত বর্ষার শুরুতে এই গাছে ফুল ফোটে। সাদা রঙের পাপড়িগুলো বেশ নজরকাড়া এবং এর ঘ্রাণ অত্যন্ত মৃদু ও স্নিগ্ধ। তবে এই পাপড়িগুলো স্বল্পস্থায়ী, ফোটার পরদিনই তা ঝরে যায়। চালতার ফল প্রায় গোলাকার, সবুজ ও দৃঢ় এবং স্বাদে টক-মিষ্টি। শরৎ ও হেমন্তকালে এই ফলগুলো পাকতে শুরু করে। চালতার আচার ও চাটনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়া এই গাছের কাঠ বেশ শক্ত ও টেকসই হওয়ায় এটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি নৌকা এবং বন্দুকের বাট তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়।