এক সময়ের চরমপন্থি সংগঠনগুলোর ব্যাপক তৎপরতায় আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছিল সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ী জেলা। এসব এলাকায় চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তবে বছরের পর বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অভিযান এবং ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত আত্মসমর্পণ কর্মসূচির ফলে এই জেলাগুলোতে চরমপন্থিদের প্রভাব ও তৎপরতা এখন অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার তিন জেলার আরও ৬৫ জন চরমপন্থি সদস্য আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় অবস্থিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১২ এর প্রধান কার্যালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিনের কাছে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে সিরাজগঞ্জের সাতজন, রাজবাড়ীর ১৩ জন এবং পাবনার ৪৫ জন সদস্য রয়েছেন।
আত্মসমর্পণ করতে আসা মো. মাজেদ আলী মুন্সী বলেন, “অন্ধকারের পথ ছেড়ে আলোর পথে আসতে পেরে আজ খুবই ভালো লাগছে।”
আরেক আত্মসমর্পণকারী আইনুল হোসেন বলেন, “ভুল পথে চলতে চলতে অনেক কিছু হারিয়েছি। এভাবে ১৫ বছর কেটে গেছে। এখন আমরা সঠিক পথে ফিরে আসছি।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনের সংসদ সদস্য মো. আমিরুল ইসলাম খান আলিম, এসআরবি ফোর্সেসের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ, পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদ এবং রাজশাহীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) শাহানা আখতার জাহান। এছাড়া সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সান্তুসহ এসআরবি ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন বলেন, “সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ী জেলার ৬৫ জন চরমপন্থি আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। তাঁদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এসআরবি মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়েছে, আত্মসমর্পণকারীদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সোমবার থেকে অস্ত্র উদ্ধারের কার্যক্রম শুরু করা হবে।
জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজবাড়ী ও আশপাশের জেলাগুলোতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাওবাদী আদর্শের নামে মোট ১৪টি চরমপন্থি সংগঠন সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-লাল পতাকা), পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি (এমবিআরএম) ও পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি (জনযুদ্ধ) উল্লেখযোগ্য।
১৯৬৮ সাল থেকে এসব সংগঠনের বিস্তার শুরু হয় এবং আশির ও নব্বইয়ের দশকে তারা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সশস্ত্র মহড়া, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল তারা। এসব সংগঠনের হাতে কয়েক হাজার মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। পরবর্তীতে আধিপত্য বিস্তার ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে এই সংগঠনগুলো বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ১৯৯৮ সালে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে শতাধিক চরমপন্থি আত্মসমর্পণ করেন। এরপর ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল পাবনায় পুলিশের কাছে ৫৯৬ জন চরমপন্থি আত্মসমর্পণ করেন। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২১ মে সিরাজগঞ্জে তৎকালীন র্যাব-১২ কার্যালয়ে সাত জেলার আরও ৩২৩ জন চরমপন্থি আত্মসমর্পণ করেছিলেন।