সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ৬৫ জন সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন। আজ রোববার দুপুরে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে অবস্থিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) কার্যালয়ে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের উপস্থিতিতে এই আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

এসআরবি-১২ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে পাবনা জেলা থেকে ৪৫ জন, রাজবাড়ী থেকে ১৩ জন এবং সিরাজগঞ্জ থেকে সাত জন রয়েছেন। তাঁরা নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি এবং নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সংগঠনের নাম ভিন্ন হলেও তাঁরা সবাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন বলে জানানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, “ভুল বুঝে যারা চরমপন্থী সংগঠনে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁরা নিজেদের ভুল উপলব্ধি করে আত্মসমর্পণ করছেন। তারা যাতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সে জন্য আইনি পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করা হবে।” দীর্ঘ ১৭ বছরের নানা জটিলতা ও সমস্যা সমাধানে তাঁদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

পাশাপাশি এসআরবির সদস্যদের আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিদের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, “অন্ধকার জগতে থাকা ব্যক্তিদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে অঞ্চল ভেদে চরমপন্থী সংগঠনে যুক্ত ব্যক্তিদের নানা সমস্যা আলোচনা করে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা হবে।”

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে আত্মসমর্পণকারীদের কাছে কোনো তথ্য থাকলে তা এসআরবিকে জানাতে অনুরোধ করেন প্রতিমন্ত্রী। তবে অস্ত্র জমা দেওয়া সংক্রান্ত একটি প্রশ্নের জবাবে ফারজানা শারমিন জানান, বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এসআরবি-১২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি আতিকুর রহমান মিয়ার সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনের সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম খান, এসআরবির মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবিব পলাশ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ, পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আশিক সাঈদ এবং রাজশাহীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) শাহানা আখতার জাহান।

বক্তারা উল্লেখ করেন যে, আত্মসমর্পণকারী অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, বিস্ফোরক দ্রব্য ও অস্ত্র সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। এসব মামলা পর্যালোচনা করে সেই অনুযায়ী তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মামলা নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে যাতে তাঁরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সুবিধা প্রদান করা হবে।

রাজবাড়ী জেলার বাসিন্দা এবং পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সালমান শাহ আজ আত্মসমর্পণ করে বলেন, “সরকার আমাদের ভালো হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। তাই অন্ধকারের পথ ছেড়ে আলোর পথে ফিরতে এখানে এসেছি। এই সুযোগ পেয়ে খুবই ভালো লাগছে। আমরা দুই ভাই এই পথে এসেছিলাম। আজ দুই ভাই একসঙ্গে আত্মসমর্পণ করেছি।”

পাবনার বাবু মিয়া ওরফে আইনুল হোসেন জানান, ভুল পথে চলার কারণে তিনি জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছেন এবং তাঁর জীবনের ১৫টি বছর এভাবে অতিবাহিত হয়েছে। এখন তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে সুন্দরভাবে বাকি জীবন কাটাতে চান।

মাজেদ আলী মুন্সী নামের আরেক আত্মসমর্পণকারী জানান, অন্ধকারের পথ ছেড়ে আলোর পথে আসতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। আলমগীর নামের একজন সদস্য বলেন, “আমরা একেক সময় একেক জায়গায় থাকতাম। যখন নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস পেতাম না, তখন অনেককে দস্যুবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়তেন।”

উল্লেখ্য যে, একসময় সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ নিয়মিত ঘটত। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান এবং সদস্যদের আত্মসমর্পণের ফলে এসব জেলায় চরমপন্থীদের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং অনেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন।

চরমপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৯৯৮ সালে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে শতাধিক সদস্য আত্মসমর্পণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল পাবনায় পুলিশের কাছে ৫৯৬ জন এবং ২০২৩ সালের ২১ মে সিরাজগঞ্জে সাত জেলার আরও ৩২৩ জন আত্মসমর্পণ করেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজ তিন জেলার ৬৫ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করলেন।