বেতন বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে। শ্রমিকদের তীব্র বিক্ষোভ ও কর্মবিরতির মুখে রোববার (১ নভেম্বর) গাজীপুরে শতাধিক এবং সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় ১৭৭টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের ফলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সোমবারও শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

গাজীপুরে শতাধিক কারখানায় ছুটি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন। রোববার (১ নভেম্বর) রাতে তিনি জানান, শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণেই এসব কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে তাঁর ধারণা, অধিকাংশ কারখানা আগামীকাল থেকে পুনরায় চালু হতে পারে।

অন্যদিকে, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় মোট ১৭৭টি কারখানায় সাধারণ ছুটি দেওয়া হয়। যদিও দুপুরের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে কিছু কারখানায় উৎপাদন কাজ শুরু হয়েছিল, তবে দিনভর উত্তেজনা এবং বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনার কারণে পরদিনও অস্থিরতা বিরাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে।

রোববার সকাল থেকেই নিট এশিয়া, আল-মুসলিম, সাবিহা অ্যাপারেলস, টাউজার লাইন, এস ২১, শারমিন ও হামীম গ্রুপের কারখানাসহ বেশ কিছু পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে দেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে নরসিংহপুর ও সংলগ্ন এলাকার শ্রমিকেরা কারখানা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এবং আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের ইউনিক ও নরসিংহপুর এলাকায় অবস্থান নেন। এর ফলে মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন।

দুপুরের দিকে সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত একেএইচ গ্রুপের একটি কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সার্ভিস লেন বন্ধ করে দিয়ে কারখানার স্থাপনা এবং বেশ কিছু যানবাহনে ভাঙচুর চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, আশপাশের কারখানার একদল শ্রমিক ওই কারখানার সামনে এসে ভেতরে কর্মরত শ্রমিকদের কাজ ছেড়ে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ছুটি ঘোষণা না করায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা কারখানায় প্রবেশের চেষ্টা করেন এবং কাচ ও ভেতরে থাকা গাড়ি ভাঙচুর করেন। এরপর তারা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রাইম টিভির সাভার উপজেলা প্রতিনিধি গোপাল মালাকার বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের হাতে মারধরের শিকার হন। পরবর্তীতে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, “মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব নতুন মজুরি ঘোষণা করা উচিত। শিল্পাঞ্চলে শান্তি বজায় রাখতে মালিকপক্ষ ও সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে মজুরি বোর্ড ও এর কার্যক্রম সম্পর্কে শ্রমিকদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া।”

শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশনস ও ইন্টেলিজেন্স) শোয়েব আহমেদ জানান, পুলিশ অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁরা জানান, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে মোট ১৭৭টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ও চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আগামীকালও শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।