এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন টাঙ্গাইলের গোপালপুরের মেধাবী শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম। ছেলের এই অভাবনীয় সাফল্যে পরিবারের পরিকল্পনা ছিল চারদিকে মিষ্টি বিতরণের। কিন্তু সেই আনন্দ উদ্যাপনের পরিবর্তে এখন আয়োজন করা হয়েছে কুলখানি। এতিম শিশুদের খাবার খাইয়ে রাকিবের আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করেছেন তার বন্ধু ও স্বজনরা। নির্মম হত্যার শিকার রাকিব আর কোনোদিন বাড়ি ফিরে এই সাফল্যের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারবেন না।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনে আনন্দের বদলে শোকের মাতম নেমে আসে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদির আটা গ্রামের খাদেমুল ইসলামের বাড়িতে। যে বাড়িতে মিষ্টির আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন ছেলের আত্মার মাগফিরাত কামনায় কুলখানির আয়োজন করা হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় গিয়েছিলেন রাকিব। তার স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ব্যারিস্টার হওয়া, দেশের সেবা করা এবং মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করা। কিন্তু অকালে ঝরে গেল সেই স্বপ্ন।
রাকিবের মা এখনও ছেলের বই-খাতা ও পড়ার টেবিল অত্যন্ত যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছেন। টেবিলের পাশে রাখা আছে তার ছবি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মাননা। ছেলের এই স্মৃতিচিহ্নগুলো আঁকড়ে ধরেই দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।
রাকিবের পরিবার জানায়, ছেলের ভালো ফলের খবর পেলে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করবেন—এমন প্রত্যাশা ছিল তাদের। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন সেই আনন্দের বদলে নতুন করে জেগে উঠেছে সন্তান হারানোর তীব্র শোক। পরিবারের অভিযোগ, হত্যা মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তারা এখনও ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা সরকারের কাছে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
রাকিবের বাবা খাদেমুল ইসলাম বলেন, “আমার ছেলের অনেক স্বপ্ন ছিল, সে ব্যারিস্টার হবে। শৈশব থেকেই পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। স্কুলজীবনে ছয়টি বৃত্তি পেয়েছে। সরকারের কাছে আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই। আসামিদের ফাঁসি দাবি করছি।”
রাকিবের মা জোহরা বলেন, “আমার ছেলেকে যারা মেরে ফেলেছে, আমি তাদের বিচার চাই। অনেক কষ্ট করে তাকে মানুষ করেছি। স্কুলে সব সময় প্রথম হতো। অনেক আশা নিয়ে ঢাকায় ভর্তি প্রস্তুতি নিতে গিয়েছিল। আমার ছেলের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা নষ্ট করে দিয়েছে তারা।”
রাকিবের এক বন্ধু বলেন, “রাকিব আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল। আজ রাকিব বেঁচে থাকলে আমাদের মিষ্টি খাওয়াত। আমি চাই, আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। আজ বন্ধুর জিপিএ-৫ পাওয়ার আনন্দে মিষ্টি খাওয়ার পরিবর্তে কুলখানির আয়োজন করেছি। এতিম শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা করেছি, যেন তারা আমার বন্ধুর জন্য দোয়া করে।”
রাকিবের চাচা বলেন, “আমার ভাতিজা অনেক ভালো ছাত্র ছিল। আজ তার ভালো ফলের আনন্দে মিষ্টি বিতরণ করতে পারছি না। মিষ্টির পরিবর্তে এতিম শিশুদের খাওয়াচ্ছি। তাকে নিয়ে পরিবারের অনেক স্বপ্ন ও আশা ছিল। সবকিছু শেষ হয়ে গেল।”
রাকিবের বড় ভাই জহুরুল ইসলাম বলেন, “আমি আর আমার ভাই একসঙ্গে ঘুমাতাম, লেখাপড়া করতাম। আমার ভাইয়ের অনেক স্বপ্ন ছিল, বড় হয়ে ব্যারিস্টার হবে। আজ ভাইয়ের জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও মিষ্টি খাওয়ানোর মতো অবস্থা আমাদের নেই। তাই এতিম শিশুদের খাবারের আয়োজন করেছি, যেন তারা আমার ভাইয়ের জন্য দোয়া করে।”
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় রাকিবকে হত্যার অভিযোগে আব্দুল্লাহ মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, হত্যার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাকিবকে জীবিত দেখিয়ে ভিডিও তৈরি করে পরিবারের কাছে পাঠানো হয় এবং মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবার চার লাখ টাকা দিলেও তাকে আর ফিরে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে নীলফামারীর ডিমলা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।