আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বর্তমানে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এই হার আরও উদ্বেগজনক, যা দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে চাকরিপ্রার্থী এবং নিয়োগকর্তাদের মধ্যে সরাসরি সেতুবন্ধন তৈরি করতে রাজধানীর বুকে আয়োজন করা হয়েছে এক বিশাল চাকরির মেলা। জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষ করে আয়োজিত এই মেলায় মোট ৫৫টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে। আয়োজকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আজ বেলা তিনটা পর্যন্ত এই মেলায় নিবন্ধন করেছেন অন্তত ৩৫ হাজার চাকরিপ্রার্থী।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উদ্যোগে আজ রোববার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এই মেলার আয়োজন করা হয়। সকালে জাতীয় যুব দিবসের অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ২৭২টি পদের বিপরীতে চাকরিপ্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি সংগ্রহের সুযোগ প্রদান করেছে।

মেলার সমন্বয়ক এবং অনলাইন চাকরির পোর্টাল বিডিজবসের প্রোগ্রাম হেড মোহাম্মদ আলী ফিরোজ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘চাকরিপ্রার্থীরা মেলায় সরাসরি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারছেন। কোনো জটিলতা ছাড়াই তাঁরা নিয়োগদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন। মেলা চলাকালে প্রায় ১০০ জন প্রার্থীর তাৎক্ষণিক চাকরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

কিউআর কোডে সিভি জমা

মেলার স্টলগুলো পরিদর্শনে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই সিভি সংগ্রহের ক্ষেত্রে আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। প্রতিটি স্টলের সামনে রাখা বড় বিলবোর্ডে কিউআর কোড দেওয়া হয়েছে। চাকরিপ্রার্থীরা তাদের মুঠোফোনের মাধ্যমে এই কোড স্ক্যান করে খুব সহজেই অনলাইনে সিভি জমা দিতে পারছেন। ফলে প্রার্থীরা আর কাগজের সিভি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর ঝামেলা পোহাচ্ছেন না।

মেলায় অংশ নেওয়া সি পি গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের সমন্বয়ক সামিয়া আক্তার ববি বলেন, ‘আমরা পাঁচ ধরনের পদের বিপরীতে সিভি নিচ্ছি। প্রার্থীরা আমাদের বুথের কিউআর কোড স্ক্যান করে সহজেই আবেদন করতে পারছেন। মেলা শেষে সিভিগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। যোগ্য প্রার্থীদের পরবর্তী সময়ে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হবে।’

সারা বছর এমন মেলার দাবি

মেলায় আসা চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষার্থী রাতিয়া নাহার ও সানজানা রহমান। ২০২৬ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করা এই দুই বন্ধু বর্তমানে চাকরির বাজারে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করছেন। আজকের এই মেলায় তাঁরা পাঁচটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিভি জমা দিয়েছেন।

রাতিয়া ও সানজানা বলেন, ‘আমাদের মতো সদ্য পড়াশোনা শেষ করা তরুণদের জন্য এ আয়োজন ভালো উদ্যোগ। তবে এমন মেলা শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনে না করে সারা বছর আয়োজন করা উচিত। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত এ ধরনের মেলা হলে চাকরিপ্রার্থীরা আরও বেশি সুযোগ পাবেন।’

তাঁদের মতে, এই আয়োজন কেবল সিভি সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়; বরং তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকার এবং নিয়োগের সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এতে করে চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতা—উভয় পক্ষেরই মূল্যবান সময়ের সাশ্রয় হবে।

পাশাপাশি সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়াতেও এই ধরনের স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এই ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে আবেদন ও নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও সহজ এবং স্বচ্ছ হতে পারে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আগে জানানো হয়েছিল, এই মেলার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার কর্মপ্রত্যাশীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, মেলায় আবেদন জমা দেওয়ার অর্থই চাকরি নিশ্চিত হওয়া নয়। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাপ্ত সিভি যাচাই করে নিজেদের নির্ধারিত নিয়োগপ্রক্রিয়া অনুযায়ী যোগ্য প্রার্থী বাছাই করবে। তাই এক দিনের এই আয়োজন শেষ পর্যন্ত কতজন তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।